দুই বছরের কাজ শেষ হয়নি ৫ বছরেও
- শেখ দীন মাহমুদ ::
খুলনার বেতগ্রাম-কয়রা ভায়া তালা-পাইকগাছা আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন (সড়ক প্রসস্ত ও বাঁক সরলীকরণ) প্রকল্পে কাজ শেষ না করে মাঝ পথে পালিয়ে যাওয়া ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সাইডে ফিরে ইতোমধ্যে ফের কাজ শুরু করেছে। চারটি উপজেলার উপর দিয়ে বাস্তবায়নাধীন সড়কের বাঁক সরলীকরণ ও প্রশসস্তকরণে তালা ও পাইকগাছা অংশে কাজ করছে তারা।
শুরু থেকে নানা অসংগতির মধ্যে শম্ভুক গতিতে এগিয়ে নেওয়া প্রকল্পে তারা নি¤œমানের উপকরণ সামগ্রী ব্যাবহার করছে। রাস্তার দু’পাশে ৬ ফুট প্রশসস্তকরণে বেড কাটিংয়ের পর বালু ফিলিং করে সাবগ্রেড ও পরে সাববেজ করতে বালু ও রাস্তা খুঁড়ে পাওয়া নি¤œমাণের ভাঙ্গা ইট,মাটি ও বাইরে থেকে নি¤œমানের ইটের খোঁয়ার ব্যাবহার হয়েছে। এরপর ডব্লিউবিএম করতে বালু ও স্টোনের পর নিয়মিত পানির ব্যাবহার হলেও তা রোলার দিয়ে চাপা হয়নি। এরপর হেজিং করতে মূল বেডের বাইিরে মাটি খুঁড়ে নি¤œমানের ইটের ব্যাবহার ও খোঁড়া মাটি বেডের ভেতর ফেলে পানি দিয়ে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এব্যাপারে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দায়িত্বে থাকা কতৃপক্ষকে বললে তারা বলেন, ইটের রং ও সাইজ খারাপ হলেও তার মান ভাল থাকায় ব্যাবহার করা হচ্ছে। এমনকি তারা বলেন, একদিন নতুন লোক থাকার সুযোগে ভাল ইটের সাথে খারাপ ইট ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে পেছনে হ্যারোর কাজ এগিয়ে আসছে ঐ সময় খারাপ ইট তুলে ভাল ইট দেওয়া হবে।
এবিষয়ে সওজের খুলনা অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী তানিমুল হককে জানালে তিনি বলেন, খারাপ ইট থাকলে অবশ্যই তা পরিবর্তনের ব্যাবস্থা করবেন। এরপরও এক সপ্তাহ অতিবাহিত হলেও ব্যাবহৃত কোন ইটই পরিবর্তন করা হয়নি।
জানাযায়, প্রকল্পের নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে অন্তত দুই দফায় তিন বছর মেয়াদ ও প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যায় বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও কাজ শেষ না করেই ৫ আগস্টেও পর পালিয়ে যায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মোজাহার এন্টারপ্রাইজের লোকজন। তারও আগে প্রকল্পের ৬৪ শতকরা কাজের অগ্রগতি দেখিয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি ১৭৮ কোটি টাকা উত্তোলন করে।
সূত্র জানায়, সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ’র) আওতায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মোজাহার এন্টারপ্রাইজ ৩৩৯ কোটি ৪৮ লক্ষ টাকা ব্যায়ে প্রকল্পটির কার্যাদেশ পায় ২০২০ সালের ২৯ ডিসেম্বর। এর আগে ওই বছরের ২১ জানুয়ারী প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায়। দুই বছর মেয়াদে ২০২২ সালের ৩০ জুন প্রকল্পটি শেষ করার কথা ছিল। তবে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানসহ নানা জটিলতায় তিন দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ে আরো তিন বছর। পাশাপাশি ব্যায় বরাদ্দ বেড়েছে আরো প্রায ৩৯ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা। প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ঝুঁকিপূর্ণ ৩৪ টি বাঁক সরলীকরণ ও তার জন্য জমি অধিগ্রহন। অথচ নানা সংকট দেখিয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান বাঁকগুলোর অধিকাংশই সোজা না করে খোঁড়া-খুঁড়িতেই সময় পার করেছে প্রায় সাড়ে চার বছর।
এব্যাপারে মোজাহার এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক নজরুল ইসলাম বলেন, তারা ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানোর আবেদন করে ফের কাজ শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে কয়রা উপজেলা অংশের অসমাপ্ত প্রায় ৭ কি:মি: রাস্তার কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। পর্যায়ক্রমে পাইকগাছা অংশের কাজও দ্রুত শেষ করা হবে বলেও জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, খুলনার কয়রা-পাইকগাছা ও ডুমুরিয়ার বেতগ্রাম পর্যন্ত ৬৪ কি:মি: দৈর্ঘ্যরে সড়কটি শেষ হয়েছে খুলনা-সাতক্ষীরা আঞ্চলিক মহাসড়কের বেতগ্রাম অংশে। সেখান থেকে খুলনা সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের আওতায় সড়কটির ‘যথাযথ মানে উন্নীতকরণ’ প্রকল্পটির ৬৪ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে বলে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে অর্ধেকের বেশি বিল দেয় সওজ। যদিও বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ তার উল্টো।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, এখন পর্যন্ত সড়কের কোথাও মানসম্মত কাজ হয়নি। অধিকাংশ জায়গায় পুরনো কার্পেটিংয়ের ওপর নতুন করে কার্পেটিং করা হয়েছে যার, অধিকাংশ স্থানে দেখা দিয়েছে ফাঁটল।
অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত পতিত সরকারের সাবেক এক প্রভাবশালী এমপির আস্থাভাজন হিসেবে কাজটি বাগিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি শুরুতেই নানা অনিয়ম-দূর্নীতির মধ্যে নি¤œমাণের সামগ্রীতে কাজ শুরু করে। এরপর শুরু হয় স্থানীয় এমপি আক্তারুজ্জামান বাবুর অবৈধ হস্তক্ষেপ। ফলে বিশেষ সুযোগ নিয়ে কাজ না করেও অর্ধেকের বেশি বিল তুলে নেয় ঠিকাদার।
এদিকে যথেচ্ছা সরকারি অর্থ লোপাট হলেও কাজের কাজ তো হয়নি। উপরন্তু সড়কের বিভিন্ন অংশ খুঁড়ে রাখায় গত ৫ বছরে সড়কটিতে চলাচল করতে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তি বেড়েছে বহুলাংশে। বিশেষ কওে গেল বর্ষা মৌসুমে পানি কাঁদায় গর্তগুলোর প্রসারতা বৃদ্ধি পেয়ে সৃষ্ট খাঁদে চলাচলের একেবারেই অনুপযোগী হয়ে পড়ে সড়কের বাঁক এলাকাগুলো। প্রায় প্রতিদিনই তখন এসব এলাকায় ঘটে ছোট-বড় দূর্ঘটনা। যদিও পরে জমি অধিগ্রহনের পর কপিলমুনি সদরের মাদ্রাসা মোড় বাদে বাঁকগুলোতে কাজ শুরু করেছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।
সর্বশেষ ৩৪টি বাঁক সরলীকরণ এলাকায় কাজ চলমান রয়েছে। নির্মাণ শেষ হওয়া কার্পেটিংয়ের বিভিন্ন স্থানেও ঢালাই উঠে গর্ত দেখা দিয়েছে। বেশিরভাগ স্থান ভারী যানবাহনের চাকায় ডেবে গেছে। সড়কের দুই পাশে গাইডওয়াল, প্যালাসাইডিংও মাটির চাপে বেঁকে গেছে। কয়রা সদর থেকে বেতগ্রাম পর্যন্ত ৩৪টি বাঁকে কাজ ফেলে রাখায় দু-তিন কিলোমিটার পর পর দুর্ভোগ মেটেনি যানবাহন চালকদের।
এরআগে মানসম্মত কাজ না হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিল দেয়ার বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ও সওজের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম প্রামাণিক বলেছিলেন, ‘প্রকল্পের পাঁচটি প্যাকেজের মধ্যে তারা তিনটি ওয়ার্ক প্যাকেজের (ডব্লিউপি) কাজ যথাযথভাবে করেছে। সে হিসাবে তার আগের প্রকল্প পরিচালক অর্থছাড়ের সুপারিশ করেন। সর্বশেষ মোজাহার এন্টারপ্রাইজের কার্যাদেশ বাতিল করে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছিল বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
সর্বশেষ সওজের খুলনা নির্বাহী প্রকৌশলী তানিমুল হক জানান, সময়মত কাজ শেষ না করায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা, নিবন্ধন বাতিলসহ কালো তালিকাভূক্তির সুপারিশ করা হয়। তবে পরে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি সময় বৃদ্ধির আবেদন করে কাজ শুরু করেছে।
তবে সঠিক মানে কাজ না হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নকে নানা ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে দাবি জনপদের সাধারণ মানুষের।