- খুলনা ব্যুরো ::
মায়ানমারের সুপারির সাথে বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবনের নৌ রুট হয়ে নিয়মিত ভারতে পাচার হচ্ছে হাজার হাজার টন শামুক-ঝিনুক। দেশী বিদেশী স্মাগলারসহ এর সাথে জড়িতরা রীতিমত আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ বনে যাচ্ছে। অবৈধভাবে শামুক-ঝিনুক আহরণ ও পাচারের এ ধারা বনজসম্পদ হ্রাসের পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও চরম হুমকির।
তথ্যানুসন্ধানে জানাযায়, সুন্দরবনের গভীর থেকে একাধিক চক্র অবৈধভাবে নিয়মিত ঝিনুক আহরণের সাথে জড়িত। প্রতিনিয়ত শত শত কেজি ঝিনুক আহরণের পর হাত বদল হয়ে পাচার হচ্ছে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে। পশুর নদীর চ্যানেল দিয়ে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে বাংলাদেশ কলকাতার নৌরুট ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ স্মাগলাররা পাচারের এ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
সূত্র জানায়, বনসংলগ্ন নদী ও খাল থেকে প্রতিদিন ট্রলার ও নৌকায় ভরে এসব শামুক আহরণের পরে এসব ট্রাকে করে সড়কপথে কিংবা ট্রলারে নদীপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাচার হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চক্রের সদস্যরা অর্থের লোভ দেখিয়ে প্রান্তিক জেলেদের এ কাজে জড়ানো হচ্ছে। প্রতিদিন কয়েক শ’ মণ শামুক সংগ্রহ করা হচ্ছে।
সম্প্রতি সাতক্ষীরার শ্যামনগরে বনবিভাগের বিশেষ অভিযানে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কেজি শামুক ও ঝিনুক উদ্ধার করা হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
বনবিভাগ জানিয়েছে, সুন্দরবন থেকে ধরে নিয়ে এসব ঝিনুক-শামুক পাচার করা হচ্ছিল। উদ্ধার হওয়া এসব ঝিনুক ও শামুক সুন্দরবনের নদীতে অবমুক্ত করা হয়।
সাতক্ষীরা রেঞ্জ অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় পদ্মপুকুর ইউনিয়নের পাতাখালী লঞ্চ ঘাট থেকে উদ্ধার করা হয় ৭৫ বস্তা ঝিনুক-শামুক। যেখানে প্রায় ১ হাজার কেজি শামুক ছিল। এসময় কওছার গাজী (৪৮) ট্রলার ড্রাইভারকে আটক করা হয়। একই দিন রাত সাড়ে ১০টার সময় বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের অধীন মহসিনের হুলো থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ৮ বস্তা (৬০০ কেজি) শামুক-ঝিনুক উদ্ধার করা হয়।
শামুক ঝিনুক পাচারে দু’টি সিন্ডিকেট খুব জোরালোভাবে কাজ করছে। একটি গ্রুপ সুন্দরবনের নৌ রুটে স্মাগলিং করছে। অন্য গ্রুপটি সড়ক পথে দালালের মাধ্যমে বস্তায় ভরে পাচারের উদ্দেশ্যে ঢাকা, চিটাগাংসহ বিভিন্ন স্থানে এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়ে যাচ্ছে। এক কেজি ঝিনুক বর্তমানে স্থানীয় বাজারে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে বিদেশে এর দাম কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় পাচারকারীরা ঝুঁকি নিয়েও প্রতিনিয়ত এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, এভাবে অবাধে ঝিনুক আহরণ করা হলে সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। কারণ ঝিনুক নদী ও খালের পানি পরিশোধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এগুলো হ্রাস পেলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং মাছের প্রজনন কমে যাবে।
স্থানীয়রা জানান, সুন্দরবনের নদীখাল যেমন কুনচিখাল, কাললাট, দলদুলির চর, কাঠেশশ্বর, কাইনমারীর চর, সাপখালির চর, পশুরতলা খাল, কৈখালীর মাদার নদী, জয়াখালী খাল, শাকবাড়িয়া নদী, কয়রা নদী ও কপোতাক্ষ নদসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থান হতে ঝিনুক উত্তোলন করে নিয়ে আসছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) ও জলজ সম্পদ সংরক্ষণ আইন ১৯৫০ অনুসারে, নদী, খাল ও প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে শামুক বা ঝিনুক আহরণ ও পরিবহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এ কাজ দ-নীয় অপরাধ।
জলজ প্রাণী বিশেষজ্ঞরা জানান, শামুক ও ঝিনুক নদীর তলদেশের মাটি ও পানির গুণগত মান বজায় রাখে। এগুলো নদীর প্রাকৃতিক ফিল্টার হিসেবে কাজ করে, দূষণ কমায়, মাটির উর্বরতা বাড়ায় এবং মাছ ও কাঁকড়ার খাদ্যচক্র ধরে রাখে। ব্যাপক নিধন হলে নদীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকিতে পড়বে।
সুন্দরবনের উপকুলের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বস্তাভর্তি শামুকের স্তূপ। চারপাশে পচা দুর্গন্ধে টেকা দায়। তখনো নারী-পুরুষ ব্যস্ত শামুক তুলতে। আকলিমা খাতুন নামের এক নারী বলেন, ‘গাঙে শামুক কুড়িয়ে দিনে এক শ কেজির মতো পাই। প্রতি কেজি পাঁচ টাকায় বিক্রি করি।’
কয়রার কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী গোবরা গ্রামের মো: আসাদুজ্জামান মৃধা বলেন, জেগে ওঠা বালুচর থেকে দিনরাত শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করা হয়। ট্রলারে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু ও শামুক একসঙ্গে ওঠানো হয়। পরে পানির ¯্রােতে বালু ধুয়ে ফেলে শুধু শামুক রাখা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বাধা দিলে আহরণকারীরা হুমকি দেন।
উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সদস্যসচিব মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, শামুক কেবল পরিবেশ নয়, স্থানীয় অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিধন চলতে থাকলে উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর পেছনের ব্যবসায়ী ও অর্থদাতাদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জেলেদের সচেতন করা এবং বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করা জরুরি।