- রিয়াছাদ আলী, কয়রা(খুলনা) ::
ঈদ মানেই পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি। ঈদ মানে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা। কিন্তু সেই সুযোগ হয় না অনেকেরই। এমন মানুষের দলে আছেন দেশের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন রক্ষায় নিয়োজিত বন বিভাগের অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। এবার বন রক্ষায় তাদের ঈদের দিনটা কেটে গেলো নির্জন বনে টহলরত অবস্থায়। ঈদের ছুটি না পেলেও দেশের সম্পদ রক্ষায় পাহারা দিতে পারায় অনেক খুশি তারা।
জানা গেছে, ঈদের সময় চোরা শিকারি চক্রের তৎপরতা বেড়ে যায়। বিশেষ করে হরিণসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী শিকারের চেষ্টা চালায়। তাই ঈদে সুন্দরবনে বন বিভাগে কর্মরত সব কর্মকর্তা ও বনরক্ষীদের ছুটি বাতিল করে কর্মস্থলে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই নির্দশনা মেনে নিয়েই বন রক্ষীরা ঈদের দিনটাও কাটিয়েছে নির্জন সুন্দরবনে।
ঈদের দিনে সুন্দরবনের বিভিন্ন ফরেস্ট স্টেশন ও টহল ফাঁড়ির কয়েকজন বনরক্ষীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে , দায়িত্বের কারণে প্রায় প্রতি ঈদেই ছুটি মেলে না তাদের। পরিবার থেকে দূরে নির্জন বনেই পালন করতে হয় ঈদ। ঈদের দিনে কাশিয়াবাদ স্টেশনে দেখা মেলে খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষণ (এসিএফ) মোঃ শরিফুল ইসলামের সাথে তিনি বলেন, বন বিভাগের স্টাফদের সাথে ঈদের দিনটি তিনি টহল কার্যক্রম চালিয়েছে। এ সময় তিনি বনরক্ষীদের বিভিন্ন দিক নির্দেশনা প্রদান করেন। সাতক্ষীরা রেঞ্জের কাছিকাটা টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ শাহিদুল ইসলাম বলেন, ঈদের দিনে স্মার্ট টিম লিডার হিসাবে ডিউটি করতে হয়েছে।
খুলনা রেঞ্জের অধিনস্থ গেওয়াখালী বন টহল ফাঁড়িতে কর্মরত বনরক্ষী রাসেল আহমেদ বলেন, প্রায় কয়েক মাস ধরেই গহিন বনে দায়িত্ব পালন করছি। লোকালয় থেকে সেখানে পৌঁছাতে নৌকায় ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা সময় লাগে। অল্প কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়েই এবারও সেখানেই ঈদ উদযাপন করতে হয়েছে । তিনি বলেন, ‘চাকুরির ৬ বছরে মাত্র একবার পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে পেরেছি। বাকি সব ঈদ সুন্দরবনেই কাটাতে হয়েছে। মন খারাপ হয়, তবে দায়িত্বই বড়। সে জন্য সব কিছু মানিয়ে নিয়েছি।
নলিয়ান ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা ডেপুটি রেঞ্জার মোবারক হোসেন জানান, গত বছর ঈদের সময় তিনি ভদ্রা টহল ফাঁড়িতে কর্মরত ছিলেন। সেখানে মুঠোফোনের নেটওয়ার্কও পাওয়া যায় না। ঈদের দিন পাঁচজন সহকর্মী মিলে একটি মুরগি জবাই করে সেমাই রান্না করে নিজেদের মতো করে ঈদ উদযাপন করেছিলেন। এবারও ঈদের দিনটি তাদের কেটেছে টহল কার্যক্রমে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘চাকুরির জন্য অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়। আমার ছোট মেয়েটা ফোন করে প্রায়ই জানতে চায় আব্বু বাড়ি আসবা কবে। তখন কী বলব বুঝে উঠতে পারি না। তাকে স্বান্তনা দিয়েছি আমি বাসায় আসছি।
কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা মোঃ নাসির উদ্দীন বলেন, ‘পরিবার-পরিজন যখন ঈদের আনন্দে ব্যস্ত, তখন আমরা বনের নিরাপত্তায় টহলে থাকছি। তার পরেও সব কিছু মানিয়ে নিতে হয়।
খুলনা রেঞ্জের অধিনস্থ নীলকোমল, কাগা, ভ্রমরখালী, পাটকোষ্টা, গেওয়াখালী, পাশাখালী, ভদ্রা টহল ফাঁড়ির স্টাফরা ঈদের দিন কাটিয়েছে ঐ বনের ভিতরে ডিউটি করে। এসব স্থানে মুঠোফোনের নেটওয়ার্কও নেই। সেখানে দায়িত্বে থাকা বনরক্ষীদের অনেক সময় ঈদের নামাজ পড়ার সুযোগও হয়নি।
পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এজেড এম হাছানুর রহমান বলেন, ‘ছুটির সময় দুর্বৃত্তরা বনের সম্পদ লুটপাট বা বন্য প্রাণী শিকারের সুযোগ নিতে পারে। এ কারণে ঈদের সময়ও সুন্দরবনের ভেতরের সব ফরেস্ট অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিবার থেকে দূরে নির্জন বনে দায়িত্ব পালন করলেও দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে পেরে গর্ববোধ করেন বনরক্ষীরা। তাদের কাছে সুন্দরবনের নিরাপত্তাই ঈদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।