- সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধি:
দিনমজুর বাবার সন্তান ফিরোজ আহমেদ। পরিবারের দারিদ্র্যতায় তাঁর লেখাপড়া করা ছিল কল্পনাতীত। কিন্তু নিজের চেষ্টা, একাগ্রতা, কঠোর পরিশ্রম ও সততায় আজ তিনি অনার্স পাশ করেছেন। অনার্স শেষ করে চাকরি নামের সোনার হরিণের পিছনে না ঘুরে নিজের চেষ্টায় করেছেন খামার, হয়েছেন একজন সফল উদ্যোক্তা ও স্বাবলম্বী।
এখন তাঁর (ফিরোজ) গরুর খামারে ১২ লাখ টাকা মূল্যের ১৬টি বিভিন্ন জাতের গরু। সেই খামারের আয় থেকে করেছেন নিজের টিনসেট আধাপাকা বাড়ি, কয়েক বিঘা আবাদি জমি, আরও আছে পুকুর ভরা মাছ ও হাঁস-মুরগীর খামার।
সফল খামারি ফিরোজ আহমেদের বাড়ি সৈয়দপুর উপজেলার বাঙ্গালীপুর ইউনিয়নের লক্ষণপুর চড়কপাড়ায়। দিনমজুর আছাবুল সরকারের পুত্র সে। তিন বোন আর এক ভাইয়ের মধ্যে সকলের বড় তিনি। এক সময় দরিদ্র বাবার যৎসামান্য আয়ে তাদের ছয় সদস্যের পরিবার ঠিকভাবে চলতো না।
যেদিন দিনমজুর পিতার কাজ মিলতো না, সেদিন পুরো পরিবারকে থাকতে হতো উপোস। কিন্তু তারপরও লেখাপড়া ছাড়েননি হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান ফিরোজ। বাড়ির কাছের লক্ষণপুর চড়কপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। এরপর ভর্তি হন লক্ষণপুর বালাপাড়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসায়। সেখানে ভর্তির পর অভাবী পরিবারের সন্তান ফিরোজের লেখাপড়া প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। কিন্তু কষ্ট করেও নিয়মিত লেখাপড়া চালিয়ে যান তিনি। দিনে এক বেলা খেয়ে না খেয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উত্তীর্ণ হয়। এরপর নিজের লেখাপড়ার খরচ যোগাতে শুরু করেন শিশুদের প্রাইভেট-টিউশনি। টিনশনির অর্থে ২০১৫ সালে দাখিল পাশ করেন। এরপর ২০১৭ সালে উপজেলার কামারপুকুর ডিগ্রী কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ২০২২ সালে নীলফামারী সরকারি কলেজ থেকে দর্শনবিদ্যা বিষয়ে অনার্স সম্পন্ন করেন। কলেজে অধ্যয়ন অবস্থায় ২০১৬ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে গরু মোটা তাজাকরণের ওপর প্রশিক্ষণ নেন। এরপর যুব উন্নয়ন কার্যালয় থেকে প্রথমে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শুরু করেন গরুর খামার। লেখাপড়ার পাশাপাশি নিজে গরু-ছাগল লালন-পালন করতে থাকেন। সেই থেকে আর পিছনে দিকে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। এখন তিনি নিজের টিনসেট আধাপাকা বাড়ির সঙ্গে গড়ে তুলেছেন ছোট আকারের একটি গরুর খামার।
তাঁর খামারে প্রায় ১২ লাখ টাকার ১৬ টি বিভিন্ন জাতের ও আকৃতির গরু রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ছয়টি ফ্রিজিয়ান জাতের গরু, ছয়টি দেশী জাতের ষাঁড় একং ০৪ টি বকনা (বাঁছুর)। আগামী ঈদুল আজহার আগে বিক্রির জন্য এ সব গরু লালন পালন করছেন তিনি। আশা করছেন ঈদের আগে এ সব পালিত গরু বিক্রি করে বেশ কিছু টাকা লাভ হবে তাঁর। গরুর খামারে স্বামী-স্ত্রী সময় দেওয়া ছাড়াও এই সব দেখভালের জন্য কয়েকজন অস্থায়ী শ্রমিক রেখেছেন। এছাড়াও চার জন স্থায়ী শ্রমিকের প্রত্যেককে মাসে ৪ হাজার টাকা করে বেতন দেন। এছাড়াও স্ত্রী রূপা আক্তারের নামে উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে নেওয়া চার লাখ টাকার ঋণের কিস্তির ১২ হাজার টাকা করে প্রতিমাসের পরিশোধ করতে হয় তাকে। গরুর খামারে পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন হাঁস মুরগীর খামার। হাঁসের খামারে তিন হাজার হাঁস রয়েছে। এ সব এখন ডিম দিচ্ছে। সে সব ডিম বিক্রি করে প্রতি মাসে ৩০ হাজার আয় করছেন ফিরোজ। নিজস্ব পুকুরে করছে মাছ চাষও। ইতিমধ্যে কয়েক বিঘা নিজের আবাদি জমিও ক্রয় করেছেন তিনি। সেই সঙ্গে অন্যের কয়েক বিঘা জমিও বন্ধক নিয়েছেন। এ সব জমিতে বিভিন্ন ফসল চাষাবাদ করছেন তিনি। এতে তাঁর সংসারে স্বচ্ছতা ফিরে আসার পাশাপাশি প্রতি মাসে লক্ষাধিক টাকা আয় করছেন।

গতকাল বুধবার সকালে ফিরোজের চড়কপাড়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিনি গরু খামার পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার কাজ করছেন। আর তাঁর স্ত্রী রূপা আক্তার গরুকে খাবার খাওয়াচ্ছেন। সেখানে বসে দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর সফলতা কাহিনী বর্ণনা করেন তিনি।
ফিরোজ আহমেদ বলেন, বাবা দিনমজুর। অনেক কষ্ট করে সংসার চালাতেন। এর মধ্যে তিন বোনকে বিয়ে দিয়েছেন। তাঁর হাঁড়ভাঙ্গা পরিশ্রমে সংসার চলতো কোন রকমে। সে সময় আমার লেখাপড়া খরচ দিবেন এমনও সামর্থ্য ছিলনা আমার বাবার। তাই বাবার কষ্ট দেখে আমার ভীষণ কষ্ট হতো। তাই আমি অষ্টম শ্রেণি থেকে ছোট ছোট শিশুদের প্রাইভেট পড়াতে শুরু করি। পাশাপাশি নিজের লেখাপড়াও অব্যাহত রাখি। অনার্স পাশ করে চাকরি পেছনে না ছুঁটে এখন নিজের বাড়িতেই ছোট পরিসরে একটি গরুর খামার গড়ে তুলেছি। নিজের ক্রয় করা জমিতে বিভিন্ন ফসল চাষ করছি নিয়মিত। সেই সঙ্গে অন্যত্র চার বন্ধু মিলে গড়ে তুলেছি একটি হাঁস মুরগীর খামারও। ওই খামার থেকেও প্রতি মাসে ভাল আয় হচ্ছে। তাঁর এ সফলতার পেছনে তাকে সার্বিক সহযোগিতা করেছে উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর। সেখান থেকে প্রশিক্ষণ ও ঋণের টাকা নিয়ে আজ আমি একজন সফল উদ্যোক্তা। তিনি বলেন, আমাদের দেশে শিক্ষিত যুবকেরা যদি চাকরি পিছনে না ছুঁটে নিজে উদ্যোক্তা হন। আমার মতো গরু ও হাঁস-মুরগীর খামার গড়ে তোলেন, তাহলে তারা স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারবেন।
সৈয়দপুর উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসার মো. মতিউর রহমান বলেন, ফিরোজ আহমেদ একজন সফল তরুণ উদ্যোক্তা। তিনি যুব উন্নয়ন থেকে প্রশিক্ষণ ও ঋণ গ্রহন করে এখন স্বালম্ববী হয়েছেন। তাঁকে অনুসরণ করে এলাকার অনেকেই এখন গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী পালন ও মাছ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।