মিজানুর রহমান মিলন, সৈয়দপুর::
আর মাত্র কয়েকদিন, চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ১৭ জুন উদযাপিত হবে পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানি ঈদ। ওই ঈদের প্রধান রীতি হচ্ছে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানি দেওয়া। এজন্য কোরবানি দিতে ইচ্ছুক মানুষজন পশু কিনতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাই কোরবানির কথা মাথায় রেখে আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে গরু-ছাগল পরিচর্যাসহ বেচাকেনায় ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারিরা।
ঈদ উপলক্ষে নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার ছোট বড় খামারিরা কোরবানির জন্য প্রস্তুত করেছেন প্রায় সাড়ে ৮ হাজার বিভিন্ন জাতের পশু। যা গত বছরের চেয়ে ২ হাজারের বেশি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে বলে স্থানীয় খামারীরা জানান।
খামারিদের সূত্রে জানা যায়, প্রতিটি খামারে গড়ে প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৮টি গরু ও ছাগল বিক্রি হচ্ছে। তবে চাঁদ ওঠার সাথে সাথে
খামারে খামারে পুরোদমে শুরু হবে কোরবানির পশু কেনাবেচা। তাই আগাম প্রস্তুতি হিসেবে খামারিরা কোরবানি উপযোগী পশু পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। সৈয়দপুর উপজেলায় খামার ও গৃহস্থের গোয়ালে যে পরিমাণ দেশি গরু ও ছাগল প্রস্তুত রয়েছে, তাতে ওইসব পশু দিয়েই সৈয়দপুর উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকাতেও কোরবানির চাহিদা মেটানো সম্ভব, এমন দাবি খামারিদের।
সৈয়দপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর এ উপজেলায় কোরবানির জন্য পশুর চাহিদা রয়েছে প্রায় ৬ হাজারের মতো। কিন্তু খামারিরা কোরবানির জন্য প্রস্তুত করেছেন প্রায় সাড়ে ৮ হাজারের মতো। যা চাহিদার চেয়ে ২ হাজারেরও বেশি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে।
সুত্রটি জানায়, কোরবানির পশু উপজেলার ক্রেতাদের চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন অঞ্চলে খামারিদের প্রস্তুত করা পশু সরবরাহ করা সম্ভব হবে। প্রাণিসম্পদ দপ্তরের সুত্রটি বলেছে, সৈয়দপুর উপজেলায় নিবন্ধিত গরু খামার রয়েছে ৭টি, ছাগল ও ভেড়ার খামার রয়েছে ৩টি। তবে নিবন্ধন ছাড়া গরু ও ছাগলের খামার রয়েছে অসংখ্য। কারণ শহর ও উপজেলার গ্রামগঞ্জের প্রায় বাড়িতেই রয়েছে ছোট ছোট খামার। এসব খামারে ৫ / ৬ টি থেকে শুরু করে ১০/১৫ টি পর্যন্ত গরু, ছাগল ও ভেড়া কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে এসব পশু। উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার বিভিন্ন ছোট বড় খামারে দেখা যায় কোরবানির পশু প্রস্তুতে তাদের ব্যস্ততার দৃশ্য।
খামারিরা বলছেন, আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে পর্যাপ্ত দেশি জাতের গরু ও ছাগল পালন করা হয়েছে। গরুকে খাবার হিসেবে কাঁচা ঘাস, ব্রান্ড, খৈল, ভুট্টা এবং ধানের কুড়াসহ প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ানো হচ্ছে। তবে পশুখাদ্যের দাম বেশি হওয়ায় গরু ও ছাগল পালনে তাদের খরচ অনেকটা বেড়েছে। তাদের দাবি চোরাইপথে ভারতীয় গরু ঢুকলে একটি পশু প্রস্তুত করতে যে পরিমাণ খরচ হয়েছে তা উঠানো মুশকিল হয়ে পড়বে। ফলে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রাখার আহবান জানান তারা। খামারিরা আরও বলেন, আসন্ন কোরবানি ঈদ উপলক্ষে যে পরিমাণ দেশি গরু ও ছাগল প্রস্তুত করা হয়েছে তাতে সৈয়দপুর তথা নীলফামারী জেলার মানুষের কোরবানির চাহিদা মেটানো সম্ভব।
সৈয়দপুরের সবচেয়ে বড় পশু খামার মেসার্স ইউসুফ হৃষ্টপুষ্ট খামার ও ইউসুফ ডেইরী ফার্ম। এটি শহরের বাঁশবাড়ী এলাকায় অবস্থিত।
সম্পূর্ণ নিরিবিলি পরিবেশে বিশাল জায়গা জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে এটি। সোমবার (০৩ জুন) দুপুরে গিয়ে দেখা গেছে সেখানে গরু পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন ১০ জন কর্মচারি। কেউ খাবার প্রস্তুত করছেন, কেউবা পৃথক পৃথক খাটালে রাখা দেশিসহ বিভিন্ন জাতের গরু ছাগলের পরিচর্যা করছেন। খামারটি জীবাণু মুক্ত রাখতে পানি দিয়ে পরিস্কার রাখাসহ প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরামর্শে কাজ করছেন অন্যান্যরা।
তাদের সাথে কাজ করতে দেখা যায় খামারটির মালিক তরুণ উদ্যোক্তা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রোটারিয়ান জামিল আশরাফ মিন্টুকে। খামারের অভ্যন্তরে গরু ছাগলের আশেপাশে যাতে মশা মাছি প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য মশারি লাগাচ্ছেন। প্রতিদিন গোসল করানোসহ তীব্র গরমে পশুর যাতে কোন সমস্যা না হয় সেজন্য সার্বক্ষণিক বৈদ্যুতিক পাখারও ব্যবস্থা করা হয়েছে ওই খামারে
কোরবানির পশু বিক্রয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে খামারটির মালিক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রোটারিয়ান জামিল আশরাফ মিন্টু বলেন, আমার খামারে কোরবানির জন্য সব দেশি প্রজাতির গরু ও ছাগল প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব পশুর দেখভালের জন্য ২৪ ঘন্টাই কর্মচারিরা কাজ করছেন। ক্রেতাদের সাড়া কেমন এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, যারা হাটে হাটে ঘুরে পশু কিনতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন না, এমন ক্রেতা বেশি আসছেন। খামারে ঘুরে পশু পছন্দ হলেই বুকিং দিয়ে রাখছেন তারা। তার খামারের বেশিরভাগ ক্রেতা হলেন চাকুরিজীবী ও ব্যবসায়ী। সৈয়দপুর ছাড়াও আশেপাশের জেলা উপজেলার এমন ক্রেতা এখানে আসছেন। পরে তাদের সুবিধামতো সময়ে বুকিং করা গরু ও ছাগল নিয়ে যাবেন। এমনকি যাদের বাসায় পশু কোরবানি করতে সমস্যা তাদের জন্য খামারেই কোরবানির ব্যবস্থা করেছেন তিনি। তাঁর খামারে গরুর দাম কি রকম জানতে চাইলে তিনি বলেন, খামারে ৬০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা মুল্যের গরু আছে।
তিনি বলেন এ যাবত দেড়শত গরু বিক্রি হয়েছে। হাটে গরু কিনতে ঝামেলা এবং বাড়তি খরচ থেকে বাঁচতে ক্রেতারা এখানে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন।তিনি জানান, ঈদের চাঁদ ওঠার সাথে সাথে বেচাকনা আরও জমবে।
সৈয়দপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শ্যামল কুমার রায় বলেন, গরুকে দানাদার খাদ্য ও কাঁচা ঘাস খাওয়ানোর জন্য খামারিদের নিয়মিত পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভিটামিন খাওয়াতেও বলা হচ্ছে খামারিদের। তবে গরুকে নিষিদ্ধ কোনো রাসায়নিক ও হরমোন ওষুধ খাওয়ানো থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে এবং তা মনিটরিং করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।