- রাবিদ মাহমুদ চঞ্চল :
সাংবাদিকতা নিঃসন্দেহে একটি মহান পেশা। কোন অবস্থায় এই মহান পেশাকে হেও করার কোন কারন বা যুক্তি নেই। ব্যক্তি সাংবাদিকের চরিত্রের নৈতিক অবক্ষয় হতে পারে কিন্তু এ পেশাকে কোন অবস্থায় হেও প্রতিপন্ন করার কোন সুযোগ নেই। আবার এটাও সঠিক যে চাঁদের কলঙ্ক নিয়েও চাঁদ সুন্দর হতে পারে কিন্তু সাংবাদিকতার পেশাকে কলঙ্কিত করার পরে এই পেশাকে সুন্দর রাখা কঠিন। তবু বলাবাহুল্য এপেশায় ব্যক্তি কলঙ্কিত হতে পারে কিন্তু সামগ্রিক ভাবে এপেশা কখনো কলঙ্কিত হতে পারে না বা সেটা সম্ভবও নয়। কেননা এই সাংবাদিকতার পেশার হাত ধরে প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের বিকাশ বিস্তৃত হয়েছে। নিয়মিতভাবে তথ্য সংগ্রহ ও প্রচারের জন্য বিশেষ প্রযুক্তির আবির্ভাবও কিন্তু এর সাথে সম্পর্কিত। তারপরও অধুনাকালে এই পেশাকে এশিয়া উপমহাদেশের “সাউথ সাব কন্টিনেন্টে” সাদরে গ্রহণ করার চেয়ে বর্জন করার মত বিষয়টিও নজর এড়াচ্ছে না। বিশেষ করে বাংলাদেশের মত নাম মাত্র মধ্যম আয়ের দেশ গুলোতে সমাদৃত এই পেশাকে কলুষিত করার জন্য একটি চক্র গড়ে উঠেছে। অপেশাদার, অশিক্ষিত,নাম সর্বস্ব শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে কিছু অনুপ্রবেশকারীরা এখানে ঢুকে পড়েছে। যার কারনে মূল ধারার সাংবাদিকদেরও এসব চাটুকার, ল্যাসপেন্সারদের কারনে সাংঘাতিক বা স্বাম্বাদিক হিসেবে গালি হজম করতে হচ্ছে।
এতকিছুর পরও নানা দিক বিশ্লেষণ করলে সাংবাদিকতার ইতিহাস ইতিহাসের শীর্ষে উঠে আসবেই, কেননা “আমাদের কাছে উপলভ্য সংবাদের পরিধি যত বৃদ্ধি পাবে এর সঞ্চলন গতি তত বৃদ্ধি পাবে”। মুদ্রণযন্ত্রের উদ্ভাবনের আগে মুখের শব্দই ছিল সংবাদের প্রাথমিক উৎস। প্রত্যাবর্তনীয় বণিক, নাবিক,ভ্রমণকারীরা মূল ভূখণ্ডে ফিরে আসত সংবাদ নিয়ে এবং এটি পরে ফেরিত্তয়ালা এবং ভ্রমণকারী খেলোয়াড়দের দ্বারা শহর থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়ত। প্রাচীন লেখকরা প্রায়শই এসব তথ্য লিখে রাখতেন। সংবাদের এই স্থানান্তর প্রায়শই অত্যন্ত অবিশ্বাস্য ছিল এবং প্রিন্টিং প্রেসের আবিষ্কারের সাথে মারা গিয়েছিল।
সংবাদপত্রগুলি (এবং স্বল্প পরিমাণে ম্যাগাজিনগুলি) আঠারো শতকের পর থেকে সাংবাদিকদের প্রাথমিক মাধ্যম, বিংশ শতাব্দীতে রেডিও এবং টেলিভিশন এবং একবিংশ শতাব্দীতে ইন্টারনেট প্রাথমিক মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিপ্রাচীন কাল থেকে এই পেশার আর্বিভাব। বিশ্ব সাংবাদিকতার জনক হলেন হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান সাংবাদিক ও সংবাদপত্র প্রকাশক জোসেফ পুলিৎজার। তবে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিত্বকে ‘সাংবাদিকতার জনক’ বলা হয়। বাংলা মুসলিম সাংবাদিকতার জনক মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ (তিনি বাংলা ভাষার প্রথম সংবাদপত্র ‘দৈনিক আজাদ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন)।বাংলাদেশের টেলিভিশন সাংবাদিকতার জনক সাইমন ড্রিং। আধুনিক সাংবাদিকতার জনক ওয়াল্টার লিপম্যান এসব গুনি মানুষের হাত ধরে সাংবাদিকতার মত মহান পেশার পথচলা শুরু হলেও বর্তমান সময়ে এই মহান পেশার টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। বিশ্বব্যাপি সমাদৃত মহান এই পেশার হঠাৎ করে আকাল বা দুরবস্থা দেখা দেওয়া কারন কি..? নেপথ্যে এমন কি হলো, যে কারণে এই পেশার ভঙ্গুর অবস্থা দেখা দিলো। বিশেষ করে বাংলাদেশে এই পেশা নিয়ে কেন জনসাধারণের মাঝে বৈরী মনোভাবের সঞ্চার হলো। সেবিষয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোচনা করা যেতে পারে।
সাংবাদিকতার দুরবস্থা কারন:
বাংলাদেশে সাংবাদিকতার দুরবস্থা বর্তমানে এক রুগ্ন ও সংকটাপন্ন বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং পেশাগত নিরাপত্তা মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। রিপোর্টার্স স্যান্স বর্ডার্স (RSF)-এর ২০২৬ সালের বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫২তম স্থানে অবস্থান করছে, যা দেশের সংবাদমাধ্যমের কাঠামোগত দুর্বলতা ও ভীতিকর পরিস্থিতির একটি স্পষ্ট প্রতিফলন।
সাংবাদিকতার এই বর্তমান সংকটের প্রধান কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. নিরাপত্তা-শারীরিক আক্রমণ-হামলা ও হয়রানি:- পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক কর্মী, দুর্বৃত্ত ও স্বার্থান্বেষী মহলের হামলার শিকার হচ্ছেন। সম্প্রতি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় (যেমন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়) এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা গুরুতর আহত হয়েছেন।
২. আইনি হয়রানি:- আগে পরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বহু সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে মামলা এবং আইনি হয়রানির ঘটনা ঘটছে।
৩. কর্পোরেট-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও মালিকপক্ষের ব্যবসায়ী স্বার্থ:- বাংলাদেশের বেশিরভাগ বড় গণমাধ্যম এখন বৃহৎ ব্যবসায়ী গ্রুপগুলোর মালিকানাধীন। তারা জনস্বার্থের চেয়ে নিজেদের কর্পোরেট ও রাজনৈতিক এজেন্ডা রক্ষায় গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে। ফলে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা বা স্বায়ত্তশাসন খর্ব হচ্ছে।
৪. লেজুড়বৃত্তি ও পক্ষপাতিত্ব:- সাংবাদিকদের একটি বড় অংশের মধ্যে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি এবং ক্ষমতার তোষামোদির যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের কাছে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নামতে নামতে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে।
৫. অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সংকট:- ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) এর তথ্যমতে, বর্তমান সময়ে “সত্য অনুসন্ধান এখন সবচেয়ে ব্যয়বহুল একটি কাজ”। একটি ভালো অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য যে সময়, ডেটা ও আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন, তা দিতে বেশির ভাগ মিডিয়া হাউস দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
৬. সেলফ-সেন্সরশিপ: আইনি জটিলতা, সরকারি চাপ এবং চাকরি হারানোর ভয়ে সাংবাদিকরা নিজেরাই অনেক গুরুত্বপূর্ণ সত্য প্রকাশ থেকে বিরত থাকছেন, যা “সেলফ-সেন্সরশিপ” বা আত্ম-নিয়ন্ত্রণ হিসেবে পরিচিত।
৭. অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বেতন বঞ্চনা: অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান নিয়মিত সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা দিতে পারছে না। ফলে সংবাদকর্মীরা চরম অর্থনৈতিক সংকটে দিনাতিপাত করছেন।
৮.অপতথ্যের আগ্রাসন:- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপতথ্য ও ভুয়া খবরের (Misinformation) দ্রুত বিস্তার মূলধারার সৎ সাংবাদিকতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৯. শিক্ষা বা যোগ্যতার অভাব:- বর্তমানে বাংলাদেশের মফস্বল অঞ্চলে নিয়োজিত শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতার মারাত্মক অভাব রয়েছে। অধিকাংশ ব্যক্তি পেরুতে পারিনি প্রাথমিক বা মাধ্যমিকের গন্ডি তারপরও তারা এখন এই পেশায় নাম লিখিয়ে নিজেকে বড় মাপের সাংবাদিক হিসেবে জাহির করতে তেলবাজি সকল গন্ডি পেরিয়ে গেছে।
১০. ক্ষমতা জাহির করা ও পয়সা কামানোর লক্ষ্যবস্তু :- একসময় সাংবাদিকতার পেশাকে বেছে নেওয়া মানুষ গুলো ছিল অনেকটাই লোভ লালসার উর্দ্ধে কিন্তু সময়ের সাথে সাথে কিছু দুষ্কৃতকারী এই পেশায় নিজেদের সম্পৃক্ত করে পয়সা কামানোর লক্ষ্যে নিয়ে এগিয়ে চলেছে দুর্বার গতিতে। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ের কিছু ব্যক্তি সম্পাদক হিসেবে পত্রিকা প্রকাশের অনুমোদন নিয়ে তৃণমূল পর্যায় সাংবাদিকতার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের হকার বানিয়ে ফেলেছে। যাদেরকে পত্রিকায় সম্পৃক্ত থাকার কারণে মাসিক বেতন ভাতা দিয়ে না দিয়ে বরঞ্চ উল্টো তাদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন।
উত্তরণের উপায়:
গণমাধ্যমের এই দুরবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে মিডিয়া সংস্কার কমিশন গঠন করে কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন। একই সাথে সাংবাদিকদের ওপর হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত, গণমাধ্যমের ওপর থেকে কর্পোরেট বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং সংবাদ কক্ষ গুলোর নিজস্ব নৈতিক নীতিমালা কঠোরভাবে বজায় রাখা জরুরি। পাশাপাশি সংবাদ পত্রের অনুমোদন দেওয়া আগে ঐ মালিক বা সম্পাদকের আয়ের উৎস নিশ্চিত হওয়া,মফস্বল সাংবাদিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সুনির্দিষ্ট মাফকাঠি নির্ধারণ করা, নিয়মিত বেতন ভাতা প্রদান, চাকুরীচ্যুত না হওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান, মফস্বল সাংবাদিকদের সম্মানি ভাতা প্রদানসহ নিয়মিত কর্মশালার মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। ভুঁইফোড় ফেসবুক পেজ খুলে সেই নামে লোগো তৈরি করে হুটহাট দাঁড়িয়ে পড়া বা ভিন্ন অফিস পাড়ায় তথ্য অনুসন্ধানে নামে চাঁদাবাজী,কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে আর্থিক সুবিধা নেওয়া অনৈতিক ও অবৈধ সাংবাদিক নামধারীদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা একান্ত আবশ্যক। এছাড়াও সর্বোপরি এ পেশার সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার আগে একজন পেশাদার গণমাধ্যম কর্মীকে নৈতিক উন্নতি সাধন এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি করার মানসিকতা প্রস্তুত করাও আবশ্যক। আর এই মহতি উদ্যোগ ক্ষমতাসীন সরকারকে নিতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ভূত ও ভবিষ্যৎতের উন্নয়নতো সম্ভব নয়,বরঞ্চ ধ্বংস অনিবার্য।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
Email: rabidchanchall@yahoo.com