মিজানুর রহমান মিলন, সৈয়দপুর::
আমদানি নির্ভরতা কমাতে দেশেই ক্যারেজ ও ওয়াগন তৈরি করা হবে। এজন্য রেলপথ মন্ত্রণালয় নিয়েছিল নানা উদ্যোগ। দীর্ঘদিন কারখানা নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার অভ্যন্তরে ক্যারেজ কারখানা নির্মাণের। এজন্য ভারতের সাথে সরকারের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয় প্রকল্পে অর্থ সহায়তা করার। কিন্তু ভারত ঋণচুক্তি না করে ২০২৩ প্রকল্প থেকে সরে যায়। ফলে অনিশ্চয়তায় পড়ে ক্যারেজ কারখানা নির্মাণ প্রকল্পটি। এতে করে ৭ বছরেও কারখানার প্রস্তাবিত জায়গায় কেবল সাইনবোর্ড শোভা পাচ্ছে। এ অবস্থায় ক্যারেজ কারখানা নির্মাণ আদৌ বাস্তবায়ন হবে কিনা তা বলতে পারছে না কেউ। অথচ কারখানাটি নির্মিত হলে বছরে ১৩০ থেকে ১৮০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতো রেলওয়ের।
সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ব্রডগেজ ও মিটারগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ ও মালবাহী যান (ওয়াগন) তৈরি করা হতো এ কারখানায়। তখন কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বাইরে থেকে কোন বগি আমদানি করতে হতো না। এতে একদিকে রাষ্ট্রের অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি অসংখ্য কর্মহীন মানুষজনের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হতো। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ষস দেড় শতাব্দী আগে ১৮৭০ সালে বৃটিশ শাসনামলে ১১০ একর জমির ওপর নির্মিত হয় দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন ও দেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে নির্মিত এ রেল কারখানায় ২৭টি উপ-কারখানা স্থাপন করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর এখানে নতুন কোচ তৈরি করা হতো। কর্মমুখর থাকতো গোটা কারখানা জুড়ে।
কিন্তু ১৯৯৩ সালে লোকসান বন্ধে রেল সংকোচন নীতির আওতায় ক্যারেজ শপে কোচ নির্মাণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ওয়াগন ও কোচের জন্য বিদেশ থেকে আমদানি নির্ভর হয়ে পড়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে। পরবর্তীতে চীন, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, জার্মানি, ভারত ও কোরিয়া থেকে বিভিন্ন ধরনের কোচ আমদানি করে আসছে রেলওয়ে। এতে প্রতিটি কোচ কিনতে হচ্ছে ৫ থেকে ৮ কোটি টাকা দরে। প্রতিবছর গড়ে ৬০টি কোচ আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪৮০ কোটি টাকা। অথচ দেশে এসব কোচ নির্মাণ করা হলে প্রতিটি কোচে খরচ নেমে আসবে অর্ধেকে।
সূত্রটি জানায়, এসব বিষয়গুলোকে মাথায় রেখে কোচের আমদানি কমাতে সৈয়দপুরে আরও একটি নতুন কোচ কারখানা নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় রেলপথ মন্ত্রণালয়। এ প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে ভারতের সাথে সরকারের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এরপরেই সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা এলাকায় নতুন ক্যারেজ কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কশপ নির্মাণে ব্যাপক সমীক্ষা চালায় বাংলাদেশ রেলওয়ে। সমীক্ষা শেষে ২০১৮ সালে সৈয়দপুর কারখানার অভ্যন্তরে দার্জিলিং গেটসংলগ্ন এলাকায় ২০ একর জমির ওপর কোচ তৈরির কারখানা স্থাপনের জায়গা নির্বাচন করা হয়। প্রকল্পের নির্বাচিত জায়গায় স্থাপন করা হয় ক্যারেজ কারখানার সাইনবোর্ড।
সুত্রটি জানায়, ভারতের সাথে সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ক্যারেজ কারখানা নির্মাণে সরকার প্রাথমিকভাবে ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। সমঝোতা স্মারক মোতাবেক প্রকল্প বাস্তবায়নে টাকা ঋণ হিসেবে দিবে ভারত । তারপরে আর কোন অগ্রগতি দেখা যায়নি।
এ অবস্থায় ২০২৩ সালে ভারত সরকার এ প্রকল্পে ঋণ সহায়তা করবে না বলে ছাত্র- জনতার গনঅভ্যুত্থানে পালিয়ে যাওয়া তৎকালীন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারকে জানিয়ে দেয়। এ কারণে থেমে যায় কাঙ্ক্ষিত ক্যারেজ কারখানা নির্মাণের কাজ। ফলে হতাশ হয়ে পড়েন রেলওয়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ এ অঞ্চলের মানুষজন। এ প্রসঙ্গে সকল শ্রেনী পেশার মানুষজনের দাবি প্রকল্পটি যাতে পুণরায় শুরু হয়। এজন্য সকল সহযোগিতা করতে রাজি তারা।
কথা হয় রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়ন কারখানা শাখার সম্পাদক শেখ রোবায়তুর রহমানের সাথে।
তিনি বলেন, দেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানাটি জনবল সংকটে ধুঁকছে। এ অবস্থায় রেলওয়ে কোচ তৈরির নতুন কারখানাটি স্থাপনের জন্য জায়গা নির্ধারণ করে সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে প্রায় ৭ বছর আগে। আর এ সংবাদে রেল কর্মচারীদের মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। তারা ভেবেছিল তাদের ছেলেমেয়েসহ এখানে অনেকের কর্মসংস্থান হবে। ঘুঁচবে বেকারত্বের। কিন্তু দীর্ঘদিনেও এটি বাস্তবায়নে কাজ শুরু না হওয়ায় আমরা হতাশ। এদিকে সংশ্লিষ্ট রেল কর্মকর্তারা বলছেন, যে টাকায় কোচ আমদানি করা হয়, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে তার অর্ধেক টাকাতেই এখানেই কোচ নির্মাণ করা সম্ভব।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার ক্যারেজ শপের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী মমিনুল ইসলাম জানান, এখন বিদেশ থেকে প্রতিটি কোচ আমদানি করতে খরচ হয় ৫ থেকে ৮ কোটি টাকা। অথচ নতুন এ ক্যারেজ কারখানাটির নির্মিত হলে রেলওয়ের অনেক লাভ হতো। তখন প্রতিমাসে অন্তত ৫টি করে বগি নির্মাণ করা সম্ভব হবে। আর প্রতিটি বগিতে খরচ পড়বে মাত্র দুই থেকে তিন কোটি টাকা। যা আমদানি খরচের চাইতে অর্ধেকে হতো।
এ বিষয়ে কথা হয় বিশিষ্ট শিল্পপতি মো. আমিনুল ইসলামের সাথে। তিনি বলেন, সৈয়দপুরে ক্যারেজ কারখানা নির্মাণ হলে রেলওয়ে কারখানায় অসংখ্য মানুষজনের কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি ফিরে আসবে কর্মচাঞ্চল্য।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সুফী নুর মোহাম্মদ বলেন, ভারতের সঙ্গে সরকারের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর ২০২২ সালে অক্টোবরে প্রকল্পটির ভৌত কাঠামোর সমীক্ষা প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। এ অবস্থায় ভারতের ঋণ প্রাপ্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় সরকার অন্য উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন,ইতিমধ্যে প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। তবে বিস্তারিত অগ্রগতি জানা নেই। প্রস্তাবিত কারখানাটি স্থাপন হলে এখানেই নতুন বগি নির্মাণ করা যাবে। তখন বিদেশ থেকে বগি আমদানি করতে হবেনা। এতে রাষ্ট্রের অর্থের সাশ্রয় হবে বলে জানান তিনি।