- মোহাঃ হুমায়ুন কবির ::
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং মাছ ও কাঁকড়ার প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশের পাস-পারমিট বন্ধ রয়েছে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা মেনে সুন্দরবননির্ভর বৈধ জেলে ও বনজীবীরা ঘরে থাকলেও তাদের জীবিকা থমকে গেছে। এরই মধ্যে প্রতিশ্রুত সরকারি সহায়তার ৮০ কেজি চাল এখনো বিতরণ না হওয়ায় বাড়ছে দুর্ভোগ।
অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞার সুযোগে কিছু অসাধু জেলে গোপনে সুন্দরবনে প্রবেশ করে বিষ প্রয়োগে মাছ-কাঁকড়া শিকার এবং বন্যপ্রাণী নিধন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কয়রা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় বর্তমানে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৩ হাজার ৫২৬ জন। তবে স্থানীয় বনজীবী ও মৎস্যজীবীদের দাবি, সরকারি তালিকার বাইরেও সুন্দরবন ও নদী- খালের ওপর নির্ভরশীল বিপুলসংখ্যক মানুষ রয়েছেন। ফলে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি বলে মনে করছেন তারা।
নিষেধাজ্ঞায় ঘরে বৈধ জেলেরা সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল কয়রার জেলে-বাওয়ালিদের কাছে জুন থেকে আগস্ট—এই তিন মাস অত্যন্ত কঠিন সময়। মাছ ও কাঁকড়া আহরণ বন্ধ থাকায় অধিকাংশ পরিবার আয়-রোজগার থেকে বঞ্চিত হয়। অনেক পরিবারকে ধারদেনা করে কিংবা বিকল্প পেশায় যুক্ত হয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে।বনজীবীদের জন্য সরকারি সহায়তা হিসেবে প্রতিটি নিবন্ধিত জেলেকে ৮০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এখনো সেই চাল বিতরণ কার্যকর হয়নি। ফলে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা প্রকৃত জেলে পরিবারগুলোর মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম বলেন, সুন্দরবন আমাদের জাতীয় সম্পদ। এর জীববৈচিত্র্য ও প্রজনন রক্ষায় ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রকৃত জেলেরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ থেকে বিরত রয়েছেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কিছু অসাধু জেলে ও চোরাকারবারি নিষেধাজ্ঞার সুযোগ নিয়ে গোপনে সুন্দরবনে প্রবেশ করে বিষ প্রয়োগে মাছ- কাঁকড়া শিকার এবং বন্যপ্রাণী নিধন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। তাই নিষেধাজ্ঞার সময়ে বন বিভাগের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কঠোর নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, একই সঙ্গে যারা আইন মেনে সুন্দরবনে প্রবেশ থেকে বিরত রয়েছেন, সেই প্রকৃত জেলে-বাওয়ালিদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব। নিষেধাজ্ঞার সময়ে তাদের জন্য দ্রুত ৮০ কেজি করে চাল বিতরণের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা, বিকল্প কর্মসংস্থান ও অন্যান্য সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে জেলেরা জীবিকার সংকট মোকাবিলা করতে পারবেন এবং সুন্দরবন রক্ষার সরকারি উদ্যোগও আরও কার্যকর হবে। ‘প্রকৃত জেলেরা আইন মেনে চলছে’
কয়রা সদর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান বলেন, “প্রকৃত জেলেরা আইনের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সুন্দরবনে মাছ ধরা থেকে বিরত আছেন। তবে কিছু অসাধু জেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বিষ প্রয়োগ করে কাঁকড়া, মাছ ও হরিণ শিকার করে যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় প্রকৃত জেলেদের সরকারি সহায়তা দ্রুত নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সুন্দরবনে অবৈধভাবে প্রবেশ ও শিকারের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
‘প্রজনন মৌসুমে বাড়ছে মাছ-কাঁকড়া’
কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন বলেন, “এই তিন মাসে সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়ার প্রজনন বৃদ্ধি পায়। এ কারণে এ সময়ে বনে প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়েছে। এরপরও কিছু অসাধু ব্যক্তি চুরি করে বনে প্রবেশের চেষ্টা করছে।”
তিনি আরও বলেন, চলমান অভিযানে বিষ প্রয়োগে ধরা মাছ ও কাঁকড়া এবং চোরাকারবারিদের কাছ থেকে হরিণের মাংসসহ বিভিন্ন সামগ্রী আটক করা হয়েছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বন বিভাগের নিয়মিত টহল অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
রাতের আঁধারে মাছ পাচারের অভিযোগ সুন্দরবন-সংলগ্ন স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পাস-পারমিট বন্ধ থাকার মধ্যেও একটি চক্র নিষিদ্ধ উপায়ে মাছ শিকার করে তা বিভিন্ন এলাকায় পাচার করছে। তাদের দাবি, প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিষ প্রয়োগে ধরা চিংড়ি মাছ রাতের আঁধারে মিনি ট্রাকে করে পার্শ্ববর্তী উপজেলা ও জেলাগুলোতে পাঠানো হচ্ছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের পেছনে প্রভাবশালী একটি মহলের মদদ রয়েছে। তাদের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাস-পারমিট ছাড়াই জেলেদের সুন্দরবনে পাঠিয়ে বিষ প্রয়োগে মাছ ধরানো হচ্ছে এবং পরে সেই মাছ বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে একটি চক্র আর্থিকভাবে লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সুন্দরবনের পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ ও প্রকৃত বনজীবীরা।
তবে স্থানীয়দের এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতাও যাচাই করা সম্ভব হয়নি। হুমকিতে সুন্দরবনের জলজসম্পদ সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার শুধু অবৈধ মাছ আহরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ে পুরো জলজ পরিবেশে। বিষ প্রয়োগের ফলে লক্ষ্য মাছের পাশাপাশি অন্যান্য জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘমেয়াদে এটি সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে
বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বনজীবীদের অভিযোগ, বৈধ জেলেরা যখন নিষেধাজ্ঞা মেনে ঘরে রয়েছেন, তখন অবৈধভাবে যারা বনে প্রবেশ করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।
দ্রুত চাল বিতরণ ও কঠোর নজরদারির দাবি স্থানীয় জেলে ও বনজীবীরা বলছেন, সুন্দরবনের প্রজনন মৌসুমে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা জরুরি। তবে একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
প্রতিশ্রুত ৮০ কেজি চাল দ্রুত বিতরণ করা হলে দরিদ্র জেলে পরিবারগুলোর দুর্ভোগ কিছুটা কমবে বলে মনে করছেন তারা।
তাদের দাবি, একদিকে প্রকৃত জেলেদের সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞার সুযোগ নিয়ে যারা বিষ প্রয়োগে মাছ-কাঁকড়া শিকার কিংবা বন্যপ্রাণী নিধন করছে তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান জোরদার করতে হবে।
সুন্দরবন শুধু জেলে-বাওয়ালিদের জীবিকার উৎস নয়, এটি উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ। তাই বৈধ জেলেদের জীবিকা ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার সময়ে অবৈধ শিকার বন্ধে কার্যকর নজরদারি—দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।