নিজস্ব প্রতিবেদক::
রাজধানীর ভাটারা থানায় দায়ের করা পর্ণোগ্রাফি আইনের একটি মামলায় ডিবি পুলিশ খুলনার দৌলতপুর থেকে ফাতেমাতুজ জোহরা ও পাইকগাছার চাঁদখালী থেকে আব্দুল্লাহ আল মামুন নামে দু’জনকে গ্রেফতার করেছে। প্রাথমিক জ্ঞিাসাবাদে তারা ঘটনার সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে ডিএমপি’র ডিবি পুলিশের ডিআইজি হারুন-অর রশীদ গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করে ব্যাপক তথ্য দিয়েছেন।
ঘটনার শিকার খুলনার পাইকগাছা উপজেলার এক বিশিষ্ট ব্যাক্তির রাজধানীর ভাটারা থানায় পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রন আইনে করা মামলায় বলা হয়, গত মাসের ৬ জুন ২৩’ ঢাকার ভাটারা থানার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার রোড নং৫/এ ব্লক-সি, ১৮ নং নিজস্ব বাসায় অবস্থানকালীণ তার যিধঃংধঢ়ঢ় নম্বরে একটি মেসেজ পাঠিয়ে বলা হয়, ভাইয়া নাম্বার ও ছবিগুলো চেনেন? বেশিকিছু বলব না, বিকেল ৪ টার মধ্যে যোগাযোগ করে আমার চাহিদা পূরণ করেন সবকিছু সেভ থাকবে। কি বলতে চাচ্ছি বিষয়টা ভেবে দেখবেন। রাজনৈতিক ক্যারিয়ারটা ভাবেন? এর পর তিনি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে ফোন করলে মহিলা ও পুরুষকণ্ঠস্বর শোনা যায়।
ধারণা করা হচ্ছে, প্রতারক চক্রের কেউ বা কারা কৌশলে তার একান্ত ও ব্যক্তিগত মুহুর্তের ছবি ও ভিডিও ধারণ করে রেখেছিল। এখন এরা সময়-সুযোগ বুঝে এসব ছবি ও ভিডিও কাজে লাগিয়ে তার কাছে ৫ কোটি টাকা দাবি করেন। এ টাকা না দিলে তারা ছবিসহ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেবার হুমকি দেয়।
সর্বশেষ তিনি বাদী হয়ে চলতি মাসের ১১ জুন অজ্ঞাতনামা মহিলা ও পুরুষের বিরুদ্ধে রাজধানীর ভাটারা থানায় ৮(১)/৮(২)/৮ (৩) ধারায় পর্ণোগ্রাফি নিয়ন্ত্রন আইনে মামলা করেন, যার নং-২২।
শুরুতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট থানার এসআই শামিমের তদন্তকালে ২/৩ দিনের মধ্যে এ মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়।
পরবর্তীতে ডিবি পুলিশ অভিযান চালিয়ে ফাতেমাতুজ জোহরা ও পরবর্তীতে আব্দুল্লাহকে গ্রেপ্তার করেন।
ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের (উত্তর) অর্গানাইজড ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের টিম লিডার অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. নাজমুল হক বলেন, ভাটারা থানায় দায়ের হওয়া মামলার বাদীর কাছ থেকে চক্রটি ব্যক্তিগত অশ্লীল ও আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও হাতিয়ে নেয়। পরে সেগুলো দেখিয়ে ৫ কোটি টাকা চেয়ে ব্লাকমেইলিংয়ের হুমকি দেয়। পরে তথ্য প্রযুক্তির সহযোগিতায় তাদের ২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তাদের ২টি মোবাইল ফোন ও ২টি সিম কার্ড জব্দ করা হয়েছে। এ ধরনের ব্লাকমেইলিংয়ের হাত থেতে বাঁচতে অনলাইনে নিজের ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও কাউকে না পাঠানোর বিষয়ে সচেতন হতে বলেন ডিবির এই সাইবার কর্মকর্তা ।
ডিবি সূত্র জানায়, চক্রের অন্যতম সদস্য ফাতেমা তুজ জোহরা প্রথমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে মোবাইল নাম্বার চাইতেন । পরে কিছুদিন মোবাইল ফোনে কথা বলার পর ভিডিও কলে কথা বলার আবদার করতেন। প্রেমিকার আবদার মেটাতে ভিডিও কল দিলে, ধীরে ধীরে আরো ঘনিষ্ট হতে বলতেন ফাতেমা। আবেগে পড়ে বিপরীত পাশে থাকা লোকেরা ভার্চুয়ালি আপত্তিকর মুহুর্ত সৃষ্টি করতেন। এমনকি নিজের ফোনে থাকা আপত্তিকর ভিডিও পাঠিয়ে দিতেন। আর এতেই ঘটতো বিপত্তি। ভিডিও কলের আপত্তিকর দৃশ্য স্ক্রিন রেকর্ডার দিয়ে রেকর্ড করে রাখতেন ফাতেমা। ফোনে কথা বলার বিশেষ মুগুর্তগুলোর অডিও রেকর্ড করে রাখতেন। দিতেন স্ক্রিনশটও। পরে এগুলো দেখিয়ে পাততেন ব্লাকমেইলিংয়ের ফাঁদ। চাহিদা মতো মোটা অঙ্কের টাকা না পেলে এগুলো বিভিন্ন গোপন পর্ণ সাইটে বিক্রি করে দিতো।
পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অডিও ভিডিও সেশন/রিয়েল সেশন বিক্রির বিজ্ঞাপন দিতো। যারা সাড়া দিতো, তাদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে ভিডিওগুলো সরবারহ করতো। মূলত: পর্ণ ভিডিওগুলোর কোড নেম হিসেবে তারা ‘সেশন’ নামটি ব্যবহার করতো। ফাতেমা ও তার চক্রের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়েছে অসংখ্য মানুষ। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। রাজধানীর ভাটারা থানায় গত ১১ই জুন পর্ণোগ্রাফি আইনে দায়ের হওয়া একটি মামলার সূত্র ধরে ফাতেমা ও এই চক্রের অপর সদস্য আব্দুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। খুলনার দৌলতপুর ও পাইকগাছা থানা এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিবি সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারকৃতরা কৌশলে বিভিন্ন ব্যক্তির পর্ণ সংগ্রহ করা ছাড়াও নিজেরা বিভিন্ন ধরণের পর্ণ ভিডিও তৈরি করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে সেগুলো বিক্রি করতো। গ্রেপ্তারকৃতদের মোবাইল ফোন ও ম্যাসেঞ্জার পর্যালোচনা করে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা দেখতে পায়, বিভিন্ন ব্যক্তির অশ্লীল আপত্তিকর পর্ণ ভিডিও বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মালয়েশিয়া, দুবাই, সৌদিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাংলা ও হিন্দি ভাষাভাষী ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেছে। তাদের পর্ণ ভিডিও গুলোর মূল ক্রেতা হলো ভারতীয় নাগরিকসহ ও বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশীরা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও রয়েছে এসব পর্ণ ভিডিওর ক্রেতা। পর্ণগ্রাফি সাইটগুলোতে বাংলাদেশি পর্ণভিডিওর চাহিদা বেশি থাকায় তারা এই পথ বেছে নেয় বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে। তারা নিজেদের ‘ফেমডম’ বলে দাবী করে এবং এসব পর্ণ ভিডিও’র ক্রেতাকে তারা ‘স্লেভ’ বলে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার হারুন-অর রশীদ সাংবাদিকদের জানান, ঢাকায় ভাড়া বাসা-বাড়িতে নারীসহ এ চক্রটির হাতে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন পর্যায়ের ধনাঢ্য ব্যক্তিসহ নানা পেশার মানুষ সর্বস্ব হারিয়েছেন।
১১ জুন ভাটারা থানার পর্ণোগ্রাফি নিয়ন্ত্রন আইনে করা ২২ নং মামলায় নারীসহ দু’জনকে গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, চক্রটি কৌশলে ভিডিও ধারণ করে বিভিন্ন নিষিদ্ধ ওয়েবসাইটে বিক্রি করত। ভিকটিমদের ব্ল্যাকমেইল করেও হাতিয়ে নিত কোটি কোটি টাকা।
তিনি জানান, গত ১১ জুন রাজধানীর ভাটারা থানায় এমন হুমকি দিয়ে পাঁচ কোটি টাকা দাবি করার অভিযোগে থানায় পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন এক ভুক্তভোগী। এ অভিযোগের ভিত্তিতে চক্রটিকে গ্রেফতার করতে মাঠে নামে পুলিশ। পরে অভিযান চালিয়ে খুলনা থেকে ফাতেমা তুজ জোহরা ও আব্দুল্লাহ আল মামুন নামে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারকৃত আসামিরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অপকর্মে জড়িত থাকার দায় স্বীকার করেছে জানিয়ে ডিবির এ কর্মকর্তা জানান, গ্রেফতার দুজন স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বিভিন্ন জায়গায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। এ চক্রটির সঙ্গে আরও অনেকে জড়িত আছেন। তাদের গ্রেফতার করতে পারলে ঢাকা শহরে এমন আরও চক্র আছে কি না, তা জানা যাবে।
এ সময় অনলাইনে নিজের ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও কাউকে না পাঠানো এবং আবাসিক হোটেল বা কারো বাসায় অবস্থানের ক্ষেত্রে গোপন ক্যামেরা আছে কি না, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন ডিবির এ কর্মকর্তা।