শেখ দীন মাহমুদ::
দীর্ঘ দিন পর কপিলমুনি কপোতাক্ষের কালী বাড়ী ঘাটের বারুণী স্নানোৎসবে যেন প্রাণ ফিরেছে। স্নানের যোগ বৃহস্পতিবার (২৭ মার্চ) ভোর ৫.২২ মিনিটের এক দিন আগে বুধবার বিকেল থেকেই কপিলমুনির বিভিন্ন মন্দির, স্নান ঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে নানা প্রান্ত থেকে উপস্থিত হতে থাকেন ধর্মপ্রাণ সনাতনীরা। এরপর নির্দিষ্ট যোগ সময় শুরু হলে নেমে পড়েন কপোতাক্ষের কালী বাড়ী ঘাটে। এ স্নান উৎসব চলে নির্দিষ্ট সময় সকাল ৯.২৬ মিনিট গড়িয়ে দুপুর পর্যন্ত।
গত আওয়ামী লীগ সরকারের শাষনামলে প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় আগে থেকে ভাটা পড়ে কপিলমুনির বারুণী স্নান কেন্দ্রীক মহা বারুণী মেলার। রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা সংকট দেখিয়ে বন্ধ রয়েছে এ মেলার। এরপর ক্রমশ সনাতনীদের স্নান উৎসবেও সংকট বাড়ে লোক সমাগমের। এরপর সর্বশেষ ৫ আগস্ট দেশে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর প্রথমবারের মত এবারের বারুণীর স্নানোৎসবে আকষ্মিক লোকসমাগম বেড়েছে বহুগুণে। এর পেছনে তাৎক্ষণিক কারণ জানা না গেলেও ধর্মের প্রতি আস্থার পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সাধারণ সনাতনীদের মধ্যে ধর্মভীরুতা বাড়িয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
২৭ মার্চ ছিল চৈত্র মাসের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী। খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনিস্থ কপোতাক্ষ নদের কালীবাড়ী ঘাটে বরাবরের মত অনুষ্ঠিত হয় বারুণীর স্নানোৎসব। ভোর ৫.২২ মিনিট থেকে শুরু হয়ে এ স্নানোৎসব চলার কথা ছিল সকাল ৯.২৬ মিনিট পর্যন্ত। তবে লোকসমাগম বৃদ্ধি পাওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ের পরও স্নান চলে দুপুর পর্যন্ত।
প্রসঙ্গত, প্রায় ৪ শ’ বছর আগে থেকে জনপদের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রতি বছর চৈত্র মাসের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশীতে কপোতাক্ষের এই স্নানে বারুণী স্নানোৎসবে মিলিত হয়। তারা বিশ্বাস করে, এই তিথিতে গঙ্গার জল এই স্থানে প্রবাহিত হয়। আর গঙ্গা জল শাস্ত্রমতে পবিত্র। তাই পুরনো পাপমোচন ও পূণ্যলাভের আশায় তারা গঙ্গা স্নান অর্থাৎ বারুণী স্নান করে থাকেন।
স্থানীয় কপিলেশ্বরী কালী মন্দিরের ভাপ্রাপ্ত সভাপতি চম্পক পাল জানান, এবছর পঞ্জিকামতে মহাবারুণী যোগ নেই তাই- এবার মহাবারুণী স্নান নয়, শুধুমাত্র বারুণী স্নানোৎসব মিলিত হন সনাতনীরা। তাছাড়া রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার-আচারণসহ বারুণী স্নানই অনুষ্ঠিত হয়।
এক সময় বারুণী স্নান উপলক্ষে কপিলমুনিতে মাসব্যাপী অনুষ্ঠিত হতো মহা বারুণী মেলা। মেলায় চিত্ত বিনোদনের জন্য যাত্রা গান, সার্কাস, পুতুল নাচ, যাদু প্রদর্শনীসহ মেলায় মাসব্যাপী বসত নানা পসরায় মনোহরী দোকান। তবে গত আওয়ামী লীগ সরকারের শাষনামলে রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা সংকট দেখিয়ে বন্ধ রাখা হয় বারুণী মেলা। সেই থেকে সনাতনীদের স্নানোৎসবের মধ্যেই শুধুমাত্র নিহিত রয়েছে বারুণী মেলা।
মেলার ইতিহাস থেকে জানাযায়, প্রায় ৪শ’ বছরেরও বেশি সময় আগে কপিল দেব নামে এক মুনি কপোতাক্ষের সুন্দরবন উপকূলীয় উপজেলার কপিলমুনি কালী মন্দির সংলগ্ন কপোতাক্ষ নদের তীরে বটবৃক্ষ মূলে তপধ্যানে মগ্ন থেকে সিদ্ধিলাভ করেন। তার সিদ্ধিলাভের দিনেই সেই স্মরণাতীত কাল থেকে জনপদের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা কালীবাড়ী ঘাটে বারুণী স্নান উৎসব পালন করে আসছেন। কথিত আছে, দ্বাপর যুগে কপিল দেবের এক ভাই জরাসন্ধ ১শ’ নৃপতিকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে নরমেধ যজ্ঞ শুরু করেন। এ লক্ষ্যে তিনি হত্যাকান্ড শুরু করলে তার বৈমাত্রেয় ভাই কপিল তাকে প্রশমনে ইশ্বরের সাহায্য প্রার্থনায় সিদ্ধিলাভের আশায় বিভিন্ন স্থানে তপধ্যান শুরু করেন।
একপর্যায়ে তিনি কপিলমুনি কপিলেশ্বরী কালীবাড়ী স্নান ঘাট সংলগ্ন বটবৃক্ষের মূলে বসে তপধ্যান শুরু করেন এবং সিদ্ধি লাভ করেন। তিনি যে যে স্থানে তপধ্যান করেন সেই সকল স্থানে বারুণী স্নান অনুষ্ঠিত হয়।