- নিজস্ব প্রতিবেদক ::
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার চাঁদখালীর বাদুড়িয়া গ্রাম। যেখানকার প্রায় শতাধিক পরিবার স্বাবলম্বী হতে বেঁছে নিয়েছেন শোল মাছের চাষকে। উপজেলার পাশাপাশি প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ এখন গ্রামটিকে এক নামেই ‘শোল মাছের গ্রাম’ হিসেবেই চেনেন। গ্রামের শত শত ছোট-বড় পুকুরে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে শোল মাছ। শোল চাষে বহু পরিবার ইতোমধ্যে স্বাবলম্বী হয়েছেন। ফলে প্রতি বছর শোল চাষে আগ্রহ বাড়ছে।
সরেজমিনে প্রতিবেদনকালে দেখা যায়, উপজেলার চাঁদখালী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাদুড়িয়া গ্রামের অন্তত তিন শতাধিক ছোট-বড় পুকুরে শোল মাছের চাষ হচ্ছে। মাত্র কয়েক বছরে শোল মাছের রাজধানী খ্যাতি পাওয়া গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছে শোল চাষে। শিক্ষিত বেকারদের পাশপাশি এখন সব বয়সী মানুষ প্রতি নিয়ত যুক্ত হচ্ছে শোল মাছ চাষে। বাড়ির আঙিনার ছোট পুকুর-পুশকুনি থেকে শুরু করে মাঝারি আকারের পরিত্যক্ত জলাশয়-সবখানেই চলছে শোল মাছের নিবিড় চাষ। মাছের খাদ্য প্রস্তুত, পুকুর পরিচর্যা ও বিপণনকে কেন্দ্র করে গ্রামজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে কর্মচাঞ্চল্য।
মাছ চাষের নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করতে প্রতিটি পুকুরের চারপাশ বাঁশের চটা (চাটাই) ও বিশেষ নেট দিয়ে ঘিরে রাখায় নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রতিটি পুকুর পরিপাটি ও দৃষ্টিনন্দন দেখায়। এ ব্যবস্থাপনায় সাপ, ক্ষতিকর পোকামাকড়সহ অন্যান্য অবাঞ্ছিত প্রাণী পুকুরে প্রবেশ করতে না পারায় মাছের সুষ্ঠু বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা তরান্বিত করছে।
স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর আগেও গ্রামের বহু মানুষ কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। অনেকেই আবার বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত ছিলেন। কিন্তু শোল মাছ চাষ পুরো গ্রামের জন্য আশীর্বাদ বয়ে এনেছে। উত্তরোত্তর সাফল্যে ভর করে পুরো গ্রামেরই অর্থনৈতিক অবস্থার দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটেছে। এখন পর্যন্ত বহু পরিবার এ মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। আর এ সাফলগাঁথায় আগ্রহ নিয়ে নিত্য নতুন যোগ হচ্ছে, উদ্যোক্তা।
শোল মাছ চাষিরা জানান, অধিকাংশ পুকুরের আয়তন ৫ থেকে ৬ শতক। এসব পুকুরে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার পর্যন্ত শোল মাছের পোনা ছাড়া হয়। খাদ্য হিসেবে প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে কাঁচা তেলাপিয়া ও সিলভার কার্প মাছ কেটে দেওয়া হয়। একটি পুকুরে দৈনিক প্রায় এক মণ পর্যন্ত মাছ খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মাছের আকার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যের পরিমাণও বাড়ানো হয়।
সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, শোল চাষে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। প্রতিদিন ভোর থেকে গৃহিণীদের নিয়ম করে মাছের খাদ্য প্রস্তুত করতে দেখা যায়। তেলাপিয়া ও সিলভার কার্প মাছ কেটে খাদ্য তৈরির কাজ এখন বাদুড়িয়া গ্রামের নিত্যদিনের চিত্র।
স্থানীয় মৎস্যচাষি মো. হাসান বলেন, মাত্র ৬ শতক (০.০৬ একর) আয়তনের একটি পুকুরে ২ হাজার ৬০০ পিছ শোল মাছের পোনা অবমুক্ত করে চাষ শুরু করেন তিনি। পোনা ছাড়ার সাত থেকে আট মাসের মধ্যে প্রতিটি মাছের ওজন দাঁড়ায় ৭০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি। বছরে প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা খরচ হয়, আর বিক্রি হয় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত। উৎপাদনের পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে এর চাহিদা ভাল থাকায় প্রতি বছর নতুন নতুন উদ্যোক্তা যুক্ত হচ্ছেন এ খাতে।
এ পেশার সাথে সংশ্লিষ্টরা জানান, পাশের খাল-বিল থেকে সংগ্রহ করা পোনাগুলো প্রথমে মশারি বা বিশেষ নেটের ভেতরে কিছুদিন লালন-পালন করা হয়। পরে উপযুক্ত আকার ধারণ করলে মূল পুকুরে ছাড়া হয়।
আরেক সফল চাষি মো. উজ্জ্বল গাজী বলেন, গত বছর ১৫ শতক আয়তনের দুটি পুকুরে ২ হাজার ৬৭০টি শোল মাছ চাষ করে প্রায় ৯ লাখ ১০ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করেছেন। যাতে তার খরচ হয়েছিল প্রায় ৪ লাখ টাকা। এ বছর সাড়ে ৪ হাজার পোনা ছেড়েছেন। আশা করছেন ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করতে পারবেন। তিনি আরও জানান, প্রায় ছয় বছর ধরে সফলভাবে শোল মাছ চাষ করে তিনি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাদুড়িয়ার উৎপাদিত শোল মাছ এখন পাইকগাছাসহ আশপাশের চাহিদা পূরণ করে এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হচ্ছে। বাজারে প্রতি কেজি শোল মাছ ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হওয়ায় চাষিরা ভালো লাভ পাচ্ছেন। ফলে দিন দিন এ চাষের পরিধিও বাড়ছে।
একসময় গ্রামের পুকুরসহ পরিত্যক্ত জলাশয়গুলোই এখন নতুন সপ্নের সারথী। অর্থনৈতিক মুক্তির আলোকবর্তিকা হয়ে পথ দেখাচ্ছে শোল মাছ।
পাইকগাছা সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সৈকত মল্লিক জানান, এলাকার মানুষ নিজ উদ্যোগে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে শোল মাছের আবাদ করে সাফল্য পেয়েছেন। যা এখন মডেল হিসেবে দেখা হচ্ছে। মৎস্য খাতের এ ধরনের উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে। উপজেলা মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হবে। পাশাপাশি শোল মাছ চাষের বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাবনা মূল্যায়নে শিগগিরই সেখানে সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন বলেও জানান মৎস্য বিভাগের এ শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা।