- শেখ দীন মাহমুদ::
ভূমি অফিসে সেবা গ্রহিতাদের হয়রানির শিকার ও দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগের উর্ধ্বে নতুন উদ্যমে এগিয়ে চলেছে পাইকগাছার ভূমি প্রশাসন। যেকোন ধরনের হয়রানি ও দূর্নীতি এড়াতে খুলনার পাইকগাছা উপজেলা ভূমি অফিসে নেওয়া হয়েছে বেশ কিছু জনবান্ধব উদ্যোগ। দ্রুত মিউটেশন নিষ্পত্তি, সরাসরি অভিযোগ শুনতে প্রতিদিন গণশুনানি, ডিজিটাল সেবায় উৎসাহ প্রদান এবং সরকারি খাস ও ভিপি সম্পত্তি রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপের কারণে স্থানীয় সেবা গ্রহীতাদের প্রশংসা পাচ্ছে স্থানীয় ভূমি অফিস তথা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ফজলে রাব্বী।
তথ্যানুসন্ধানে জানাযায়, ৪০তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. ফজলে রাব্বী ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর পাইকগাছা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে যোগদান করেন। মূলত এরপর থেকেই দিনবদলের চিত্র দৃশ্যমান হয় পাইকগাছা ভূমি অফিসের। মূলত সাধারণ সেবাগ্রহতিাদের যে কোন ধরনের হয়রাণি এড়াতে সকল প্রকার সেবা প্রক্রিয়া সহজতর ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি হ্রাসের উপর গুরুত্ব দিয়ে কার্যক্রম ত্বরান্বিত রেখেছেন তিনি।
মিউটেশনে কমছে ভোগান্তি:
ভূমি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলোর একটি নামজারি (মিউটেশন)। জমির মালিকানা পরিবর্তনের পর নামজারি করতে গিয়ে দীর্ঘসূত্রতা ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে দেশের প্রত্যন্ত এলাকায়। তবে পাইকগাছায় বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় দ্রুত নামজারি নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অনলাইনে আবেদন, নির্ধারিত সময়ে শুনানি এবং আবেদন নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় নজরদারির ফলে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তি কমেছে বলে জানান সেবাগ্রহীতারা।
সেবাপ্রহীতাদের অনেকেই বলেন, আগে ভূমি অফিসে একটি কাজের জন্য একাধিকবার আসতে হতো। এখন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকলে নিয়ম অনুযায়ী দ্রুত সেবা পাচ্ছেন তারা।
প্রতিদিন গণশুনানি:
ভূমিসেবাকে আরও জনবান্ধব করতে পাইকগাছা উপজেলা সর্বপ্রথম ভূমি অফিসে চালু করা হয়েছে প্রতিদিন গণশুনানি। ভূমি সংক্রান্ত সমস্যা, অভিযোগ ও আবেদন নিয়ে আসা নাগরিকদের কথা সরাসরি শুনছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ফজলে রাব্বী।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গণশুনানিতে সেবাগ্রহীতার অভিযোগ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। কোনো অভিযোগের তাৎক্ষণিক সমাধান সম্ভব না হলে সেবাগ্রহীতাকে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কেও সুপরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, গণশুনানির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ভূমি সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে সাধারণ মানুষ সরাসরি কর্মকর্তার কাছে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাসের পাশাপাশি ভূমি অফিসের সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ছে।
একজন সেবাগ্রীতা বলেন, ভূমি সংক্রান্ত সমস্যার কথা সরাসরি সহকারী কমিশনার (ভূমি) মহোদয়কে জানাতে পারছি। তিনি মনোযোগ দিয়ে কথা শুনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এতে আমাদেও ভোগান্তির উল্টো স্বস্তি এসেছে।
সরকারি জমি উদ্ধারে উদ্যোগ:
নাগরিক সেবার পাশাপাশি সরকারি সম্পত্তি রক্ষায়ও তৎপর রয়েছে উপজেলা ভূমি প্রশাসন। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ব্যক্তির দখলে থাকা সরকারি খাস ও ভিপি (অর্পিত) জমি চিহ্নিত করে উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, উদ্ধার করা জমি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা ও ইজারা দেওয়ার মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে খাসজমি ব্যবস্থাপনা, ভূমি উন্নয়ন কর আদায় এবং সরকারি সম্পত্তির অবৈধ দখল প্রতিরোধেও কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি দীর্ঘদিন বিভিন্ন ব্যক্তির দখলে থাকা সরকারি ভিপি জমি উদ্ধারের ঘটনাও এলাকায় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জমি উদ্ধারের পর নিয়ম অনুযায়ী ইজারা দেওয়ার মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
সেবার তথ্য পৌঁছাচ্ছে মানুষের কাছে:
ভূমিসেবা মেলা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে ডিজিটাল ভূমিসেবার সুবিধা সম্পর্কেও সাধারণ মানুষকে জানানো হচ্ছে। অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, নামজারি, খতিয়ানসহ বিভিন্ন সেবা গ্রহণের বিষয়ে নাগরিকদের সচেতন করা হচ্ছে।
ভূমি প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি হ্রাস, সরকারি সম্পত্তি রক্ষা এবং রাজস্ব আদায় এই তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। নিয়মের মধ্যে থেকে সেবাগ্রহীতাদের দ্রুত সেবা দেওয়াই তাদের লক্ষ্য।
ভূমি অফিস জনগণের সেবার প্রতিষ্ঠান:
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ফজলে রাব্বী বলেন, ভূমি অফিস জনগণের সেবার প্রতিষ্ঠান। সাধারণ মানুষ যাতে কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই ভূমিসেবা পান, তা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। সেবাগ্রীতাদের অভিযোগ সরাসরি শুনে নিয়ম অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি। তিনি আরও বলেন, কোনো নাগরিকের সমস্যা থাকলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ ভূমি অফিসে এসে সরাসরি জানাতে পারেন। নিয়মের মধ্যে থেকে তাদের সমস্যা সমাধানে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে।
সর্বোপরি স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, প্রতিদিন গণশুনানি চালু, ভূমিসেবায় গতি আনা এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ এসব পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভূমি প্রশাসনের দূরত্ব কমাতে ভূমিকা রাখছে। তাদের প্রত্যাশা, এ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ ও অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। যা পাইকগাছার ভূমিসেবায় মানুষের আস্থা আরও বাড়বে বলেও মনে করেন তারা।