মিজানুর রহমান মিলন, সৈয়দপুর::
ঈদ মানেই নতুন পোশাক, আনন্দ আর হাসিতে ভরা একদিন। কিন্তু সমাজের অনেক শিশুর সেই আনন্দ অনেক সময় হতাশায় নিমজ্জিত হয়। নতুন পোশাক কেনার সামর্থ্য না থাকায় অন্যদের আনন্দ দেখে নীরবে কাঁদে তারা। সেইসব সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে ঈদের আগেই হাসি ফুটিয়েছে সেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন আমাদের প্রিয় সৈয়দপুর। বরাবরের মতো এবারও মাত্র ১ টাকার বিনিময়ে শতাধিক শিশুকে দেওয়া হয়েছে ঈদের নতুন পোশাক।
গতকাল শনিবার (১৪ মার্চ) সৈয়দপুর শহরের গোলাহাট এলাকায় একটি স্কুল চত্বরে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানে ওইসব পোশাক বিতরণ করা হয়। সেখানে দেখা যায় অভূতপূর্ব এক দৃশ্য। একটি স্কুলের পাশে সামিয়ানা টাঙিয়ে বসানো হয়েছে পোশাকের অস্থায়ী দোকান। দোকানের সামনে একটি ব্যানারে লেখা ছিল ‘১ টাকায় ঈদের নতুন জামা’। ব্যানারটি দেখে দোকানের ক্ষুদে ক্রেতা আশেপাশের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে দেখা যায় আনন্দ আর সকলের মাঝে ছিল হাসির ঝিলিক।
দোকানের সামনে জড়ো হয় শতাধিক শিশু।
এদের হাতে ছিল এক টাকার কয়েন ছাড়াও কাগজের নোট। সকলেই আনন্দের হাসি নিয়ে লাইনে দাড়ায় ১ টাকায় ঈদের নতুন পোশাক কেনার জন্য। দোকানের ভেতরে ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা যায় কয়েকজন তরুণ স্বেচ্ছাসেবীকে। তারা ক্ষুদে ক্রেতা
শিশুদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলছেন, তাদের পছন্দের পোশাক দেখাচ্ছেন, আবার সাইজ মিলিয়ে দিচ্ছেন। পছন্দ হলেই ক্রেতার কাছ থেকে ১ টাকা নিয়ে তুলে দিচ্ছেন নতুন ফ্রক, পাঞ্জাবি, শার্ট কিংবা প্যান্ট। পোশাকের প্যাকেট হাতো পেয়েই তাদের মাঝে দেখা যায় ঈদের আমেজ। এভাবে মাত্র ১ টাকার বিনিময়ে ঈদের নতুন পোশাক পেয়ে আনন্দে মেতে ওঠে সৈয়দপুরের শতাধিক সুবিধাবঞ্চিত শিশু।
মূলত সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ঈদের আনন্দে শামিল করতে বরাবরের মতো এবারও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে ১ টাকার বিনিময়ে ঈদের নতুন পোশাক বিক্রি করে স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন ‘আমাদের প্রিয় সৈয়দপুর’।
সংগঠনটির সদস্যদের উদ্যোগে গোলাহাট এলাকায় বসানো হয় এই ব্যতিক্রমী ১ টাকার দোকান’। সেখানে নতুন ফ্রক, পাঞ্জাবি, শার্ট, প্যান্টসহ শিশুদের নানা ধরনের পোশাক সাজিয়ে রাখা হয়।
গোলাহাট এলাকার শিশু রেহান (১০) ও আকাশি (৮) জানায়, তাদের পরিবারে আর্থিক কষ্টের কারণে ঈদের সময় নতুন কাপড় কেনা অনেক সময় সম্ভব হয় না।
এখানে ১ টাকায় নতুন জামা দেওয়া হচ্ছে শুনেই তারা ছুটে আসে। রেহান জানায়, অভাব অনটনের কারণে বাবা মা আমাদের পোশাক কিনে দিতে হিমশিম খান। এখানে ১ টাকায় ঈদের নতুন পোশাক দিচ্ছে জানতে পেরে খুব ভালো লেগেছে। আকাশি হাসিমুখে জানায়, আমি নিজের পছন্দের একটা ফ্রক নিয়েছি। খুব সুন্দর লাগছে। ঈদের দিন এটা পরবো।”
শুধু শিশুদের পোশাকই নয়, এই এক টাকার দোকানে রাখা হয়েছে অসহায় মানুষের জন্য শাড়ি, লুঙ্গি ও থ্রি-পিসও। দরিদ্র মানুষরাও মাত্র ১ টাকার বিনিময়ে এসব পোশাক সংগ্রহ করতে পারছেন।
মাত্র এক টাকায় নতুন পোশাক হাতে পেয়ে মহাখুশি অসহায় শিশু সাবিনা (১২) ও কৌশিক (৮)। তাদের দু’জনেরই বাবা নেই। মা অন্যের বাসায় কাজ করে সংসার চালান। এখনো তাদের জন্য নতুন জামা কিনে দিতে পারেননি তিনি।
সাবিনা জানায়, আমার মা বলছিলেন হয়তো এবার নতুন জামা হবে না। কিন্তু এখানে এসে ১ টাকায় নতুন জামা পেলাম। খুব ভালো লাগছে। কৌশিকও নতুন পোশাক হাতে নিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে, এবার ঈদে নতুন জামা পরে ঘুরতে পারবো।
সংগঠনের সদস্য মিথুন, সামিউল, রাজা, রাব্বি, রকি জানান, সমাজে অনেক সুবিধাবঞ্চিত শিশু রয়েছে যারা প্রায় সব উৎসবেই বঞ্চিত থাকে। ঈদের সময় নতুন পোশাক তাদের কাছে স্বপ্নের মতো।
তারা বলেন, ঈদ সবার জন্য আনন্দের দিন। কিন্তু অনেক শিশুই নতুন কাপড় কিনতে পারে না। তাই সেইসব শিশুদের মুখে একটু হাসি ফোটাতেই আমাদের এই উদ্যোগ।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা নওশাদ আনসারী বলেন, আমাদের এই আয়োজন মূলত এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য। যেসব শিশুদের ঈদের নতুন জামা হয়নি, তারা এখানে এসে মাত্র এক টাকার বিনিময়ে নিজের পছন্দের পোশাক নিতে পারছে। আমাদের সংগঠনের সদস্যরা নিজেদের অর্থায়নে এই আয়োজন করেছে।
তিনি আরও জানান, শুধু পোশাক নয়, পর্যায়ক্রমে অসহায় মানুষের মধ্যে শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রি-পিসের পাশাপাশি সেমাই, চিনি ও দুধও বিতরণ করা জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের এমন কার্যক্রম ঈদের চাঁদ রাত পর্যন্ত চলবে।
উল্লেখ্য, প্রতি বছরই ঈদকে সামনে রেখে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য নতুন পোশাক, সালামি এবং দরিদ্র মানুষের জন্য শাড়ি, লুঙ্গি, থ্রি-পিসসহ বিভিন্ন সহায়তা দিয়ে আসছে ‘আমাদের প্রিয় সৈয়দপুর’ সংগঠনটি। শিশুরা সবসময়ই ঈদের দিনে নতুন জামা পরতে চায়। কিš‘ দারিদ্র্যের কারণে অনেক শিশুর সেই ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে যায়। আর সেই অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে সৈয়দপুরের তরুণদের এই সংগঠন।
তাদের এমন উদ্যোগই হয়তো অনেক শিশুর ঈদের আনন্দকে করে তুলেছে রঙিন, উজ্জ্বল আর স্মরণীয়।