- আশাশুনি(সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি :
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তীব্র নিরাপদ পানির অভাব, তাপপ্রবাহ, লবণাক্ততা, ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ এবং মা-শিশুর অপুষ্টিসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং মাঠপর্যায়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আশাশুনি উপজেলার স্বাস্থ্য পরিদর্শক, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক, স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক ও পরিবার কল্যাণ সহকারীদের অংশগ্রহণে তিন দিনব্যাপী টিওটি এবং ছয় দিনব্যাপী সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গত ১৫ জুন থেকে ২৫ জুন ২০২৬ পর্যন্ত সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কনফারেন্স রুমে ইএসডিও-ইডিএম কর্তৃক বাস্তবায়িত ‘রিচ’ প্রকল্পের সহযোগিতায় এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। এতে উপজেলার ৪৩ জন স্বাস্থ্যকর্মী অংশগ্রহণ করেন। প্রথম ধাপে সুপারভাইজারদের নিয়ে তিন দিনব্যাপী টিওটি (ট্রেইনিং অব ট্রেইনার্স) অনুষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তীতে তাদের পরিচালনায় ছয় দিনব্যাপী সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ কর্মশালা সম্পন্ন হয়।
প্রশিক্ষণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নিতীশ চন্দ্র গোলদার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. সেলিম হোসেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নিতীশ চন্দ্র গোলদার বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গর্ভবতী মা ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। লবণাক্ততার কারণে উচ্চ রক্তচাপ, নিরাপদ পানির সংকটে ডায়রিয়া এবং জলাবদ্ধতার ফলে মশাবাহিত রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে স্বাস্থ্য শিক্ষা সেশনের সাহায্যে এসব বার্তা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে।”
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. সেলিম হোসেন বলেন, “মা ও নবজাতকের নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব বৃদ্ধি করতে এ ধরনের প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।”
প্রশিক্ষণে রিসোর্স পারসন হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইএসডিও-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. মাসুকুল হক মাসুক, সহকারী প্রকল্প ব্যবস্থাপক লিটন হোসেন, ফিল্ড সুপারভাইজর তারিসা রহমান এবং লুৎফুল হাসান।
কর্মশালায় মোট ১১টি অধিবেশনের মাধ্যমে জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্য বার্তা, তাপপ্রবাহে করণীয়, নিরাপদ পানির ব্যবহার ও পানি বিশুদ্ধকরণ পদ্ধতি, কিশোরী স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি, একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পান, গর্ভবতী মায়ের যত্ন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা ও তার প্রতিকার বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
অধিবেশনগুলো অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে দলীয় কাজ, উপস্থাপনা ও মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্য শিক্ষা বিষয়ে সামনের সারির স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের উঠান বৈঠকে কার্যকর ও আকর্ষণীয় স্বাস্থ্য শিক্ষা সেশন পরিচালনার দক্ষতা বৃদ্ধি ছিল এ প্রশিক্ষণের অন্যতম উদ্দেশ্য।
প্রশিক্ষণ শেষে স্বাস্থ্য সহকারী চয়ন রানী বলেন, “আগে আমরা শুধু টিকাদান ও ওষুধ বিষয়ে কথা বলতাম। এখন থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কেও মায়েদের সচেতন করতে পারব। এতে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।”
আরেক প্রশিক্ষণার্থী কাকলি রাণী দাস বলেন, “আগে উঠান বৈঠকে সুন্দর ও গুছিয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা সেশন পরিচালনা করতে কিছুটা সংকোচ বোধ করতাম। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সেই জড়তা কেটে গেছে। এখন আমরা জানি কীভাবে একটি কার্যকর স্বাস্থ্য শিক্ষা সেশন পরিচালনা করতে হয়।”
আয়োজকরা জানান, এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর্মীরা সমাজে পরিবর্তনের দূত হিসেবে কাজ করবেন এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।
উল্লেখ্য, ক্লাইমেট একশন এট লোকাল লেভেল কনসোর্টিয়াম এর গর্ভবতী নারী, শিশু ও কিশোরীদের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাস’ শীর্ষক ‘রিচ’ প্রকল্পটি সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলায় জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে।