1. sheikhnadir81@gmail.com : admin :
  2. tapon.tala@gmail.com : Tapon Chakraborty :
  3. bdtiu7t93g@outlook.com : wpp9nopr :
শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৮ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম:

বাংলাদেশী না বাঙালি জাতীয়তাবাদ: আমাদের দর্শন কোনটা!

  • প্রকাশিত : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৪ বার পঠিত
17410
রাবিদ মাহমুদ চঞ্চল:

বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ নাকি বাঙালি জাতীয়তাবাদ?এনিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। “নানা মুনির নানা মত” প্রবাদের মত জাতীয়বাদকে নানা যুক্তি-তর্কে বিভাজন করে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বসবাস করে,এদেশের মুক্ত আকাশে বুক ভরে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করেও এখনো অনেকেই বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের আস্থা রাখতে পারেন না বা বিশ্বাস করেন না।

তাদের মতে, তারা বাংলা ভাষায় কথা বলেন, প্রাচীন বাঙালিয়ান সাংস্কৃতির আদলে নিজেদেরকে পরিচালনা করেন,সে কারণে এখনো বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিশ্বাস করেন এমনকি এটাই হওয়া উচিত বলেও তারা মনে করেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন,যেহেতু ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান গঠনের সময়কাল থেকে পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে পৃথক একটি রাষ্ট্র সত্ত্বার ধারণা নিয়ে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামের পৃথক একটি রাষ্ট্র অর্জন করার ফলে সম্পূর্ণরূপে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ আমাদের মনে প্রানে ধারণ ও লালন করা উচিত। এই তর্ক বিতর্কের নিরসনকল্পে সংক্ষিপ্ত পরিসরে ইতিহাসের পাতা থেকে কিছু বিষয় আলোচনা করলে হয়তোবা পরিপূর্ণ ভাবে আমরা আসলে কোন জাতীয়তাবাদের বিশ্বাসী হব বা বিশ্বাস করা উচিত হবে এ সংক্রান্ত একটি স্পষ্ট ধারণা অর্জন করা যেতে পারে।
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিতর্ক তোলা হয় প্রায়ই। বাংলাদেশের ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীদের মধ্যে আচরণে কিছু মিল আছে, আমাদের ভাষাও এক হতে পারে, কিন্তু জাতীয় সত্ত্বায়,জাতীয় ভাব-আবেগে এবং জাতীয় স্বার্থে আমাদের মাঝে কত দূর মিল আছে এপ্রশ্ন এসে পড়া খুবই স্বাভাবিক।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো-“আমরা দুটি ভিন্ন ভিন্ন স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অধিবাসী”। আমাদের অনুভূতি, আমাদের স্বার্থ, আমাদের আদর্শ, আমাদের রাষ্ট্রচিন্তা, আমাদের সামাজিক দর্শন এক নয়। এমনকি আমরা এক সরকারের অধীনের শাসিত নই। বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থ লেখকদের লেখা থেকে দেখা যায়, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কিছু সংখ্যক লোক ধোয়া তুলেছিল যে, যেহেতু আমরা এক ভাষাভাষী,যেহেতু বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে এক হয়ে মিলে যাওয়া উচিত। কিন্তু এই স্বপ্ন বাস্তবসম্মত ছিল না। আর এর বিরুদ্ধে দুই অংশের লোকের অবস্থান ছিল কঠোর। রাজনৈতিক কারণে ভারত সরকারও এই পরিকল্পনার পক্ষপাতী ছিল না। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বোস বাংলাকে বিভক্ত না করে অবিভক্ত বাংলা রাখার প্রস্তাব দেন কিন্তু পশ্চিমবাংলার সংসদের অধিকাংশ হিন্দু সদস্যই এর বিপক্ষে ভোট দিয়ে এই কল্পনাকে বাস্তবায়িত করতে দেননি। স্বয়ং পন্ডিত জহরলাল নেহেরুও ছিলেন এই পরিকল্পনার ঘোর বিরোধী।
তদানীন্তন গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেন কে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, যদি বাংলাকে অখন্ড রাখা হয় তবে তিনি ও তার ভারতীয় কংগ্রেস মাউন্টব্যাটেনের ভারত বিভাগ প্লান মেনে নেবেন না। ১৯৭১ সালে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে, রক্তাক্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান-পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসেছে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে আত্ম প্রতিষ্ঠার পর আবারো উপমহাদেশের এই অঞ্চলে সমস্ত বাংলা ভাষাভাষী মিলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র স্থাপন করতে পারে। ভাসানীর এই আহ্বানকে পশ্চিমবাংলার বাঙালি হিন্দু নেতৃবর্গ এই বলে প্রদক্ষণ করেন যে,তারা ভাষায় বাঙালি হলেও জাতি হিসেবে ভারতীয়,বাঙালি নয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, মানব সন্তানদের একটি অংশকে জাতি হিসেবে তখনই গণ্য করা যেতে পারে, যখন তারা নিজেদের মধ্যে স্বেচ্ছায় অনুভূতি দ্বারা ঐক্যবদ্ধ হয়, যে সহানুভূতি অন্য কারো সঙ্গে থাকেনা। ওই সহানুভূতির কারণে তারা একে অন্যের সঙ্গে সহযোগিতা করে, যা তারা অন্য লোকের সঙ্গে করে না। তারা সবাই একসঙ্গে বসবাস করতে চায় এবং কামনা করে যে সরকার তাদের দ্বারা অথবা তাদের মধ্য নেয়া কিছু লোক দ্বারা গঠিত হবে এবং সেই সরকার দ্বারা তারা শাসিত হবে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের এই সংজ্ঞার মধ্য দুটি উপাদান বিশেষভাবে লক্ষণীয়, “প্রথমত- “যখন তারা নিজেদের মধ্যে স্বেচ্ছায় অনুমতি সহকারে ঐক্যবদ্ধ হয়” আর দ্বিতীয়ত- “তারা সবাই একই সরকারের অধীনে শাসিত হতে চায় “। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সমভাষাভাষীদের মধ্যে কিছু মিল থাকলেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের সংজ্ঞা অনুযায়ী উল্লেখিত দুটি উপাদানের অভাব সুস্পষ্টভাবে পরিষ্কার। সুতরাং বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন দৃষ্টি পোষণ করে। এ দুই জাতীয়তাবাদের মধ্যে রয়েছে যোজন যোজন দূরত্ব।
যদি আরো একটু খোলসা করে বলা হয় তাহলে দেখা যায়, বাঙালি জাতীয়তাবাদ হলো শুধু মাত্র ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা জাতিগত পরিচয়, যা মূলত বাঙালি জাতিসত্তা ও ভাষাভিত্তিক ঐক্যের ওপর জোর দেয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ হলো ভৌগোলিক সীমানাভিত্তিক নাগরিক পরিচয়, যা ধর্ম, বর্ণ ও জাতি নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের একত্রে বসবাস ও সার্বভৌমত্বকে গুরুত্ব দেয়।
মূল পার্থক্যসমূহ ভিত্তি: বাঙালি জাতীয়তাবাদ ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ওপর প্রতিষ্ঠিত, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড এবং নাগরিক ঐক্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। কিন্তু বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ নির্দিষ্ট ভূখণ্ড এবং নাগরিক ঐক্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। পরিধিগত ভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিধি শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষী মানুষ পর্যন্ত বিস্তৃত। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের পরিধি শুধুমাত্র বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বাঙালি জাতীয়তাবাদে অ-বাঙালি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর স্বকীয়তা কিছুটা গৌণ হয়। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে ভূখণ্ডের সকল জাতিগোষ্ঠীকে একীভূত করার কথা বলা হয়।
উৎপত্তি ও বিকাশের ক্ষেত্রে ভাষা আন্দোলনে বাঙালি জাতীয়তাবাদ মূখ্য থাকলে ও মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ মুখ্য ছিল। কেননা পশ্চিম পাকিস্তানের কাছ থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে পৃথক করে বাংলাদেশ নামের একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব অর্জন করাই ছিল স্বাধীনতাকামী মানুষের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। সুতরাং সার্বিক পরিস্থিতি,প্রেক্ষাপট ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞার আলোকে আলোচনা করে আমরা সুস্পষ্টতো বলতে পারি আমরা যারা স্বাধীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে বসবাস করছি, আমাদের মধ্য থেকে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করে সেই সকল জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত সরকার ব্যবস্থার উপর আস্থা রাখছি এবং সেই সরকার দ্বারা আমরা শাসিত হচ্ছি। সুতরাং সার্বিক বিচার বিশ্লেষণ করে বলা যায় বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদই হলো আমাদের আসল পরিচয়।
17422

সংবাদটি শেয়ার করুন

একই বিভাগের সকল খবর