নিজস্ব প্রতিবেদক, পাইকগাছা::
খুলনার পাইকগাছার বহুলালোচিত জোনাকি গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি কতৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোটি কোটি আত্মসাৎ ও সেসব পাওনা টাকা আদায়ের দাবিতে ভূক্তভোগী গ্রাহকরা সড়ক অবরোধ কর্মসূচী পালন করেছে। শনিবার বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত শত শত নারী-পুরুষ উপজেলার সরল বাজারস্থ সমিতির কার্যালয় সংলগ্ন প্রধান সড়ক অবরোধ করে এ কর্মসূচী পালন করেন।
এসময় তারা অভিযোগ করেন, তাদের অন্তত ২ হাজার গ্রাহকের প্রায় ৫ কোটি টাকা সমবায় সমিতির নামে উত্তোলন করে কতৃপক্ষ আত্মসাৎ করেছেন। এসব গ্রাহকরা তাদের পাওনা বুঝে পেতে গত প্রায় ৩ বছর ধরে নানা কর্মসূচীতে আন্দোলন করে আসছে।
সর্বশেষ শনিবার (১৭ মে) তারা সমিতির সঞ্চয়/পাশ বই হাতে নিয়ে ‘টাকা চাই দিতে হবে, পাওনা টাকা না দিলে, ঘরে আর ফিরবো না, সমিতি কতৃপক্ষের অবৈধ সম্পদ অবিলম্বে জব্দ করে, গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে হবে, কোন চক্রান্ত মেনে নেওয়া হবে না’ এ ধরনের নানা স্লোগানে ভর করে তারা সরলের রাজপথ ভারী করে তোলেন। এসময় সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে কয়েক কিলোমিটার সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে থানার দায়িত্ব প্রাপ্ত ওসি ইদ্রিসুর রহমান ও উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা হুমায়ূন কবির ঘটনাস্থলে এসে তাদের পাওনা টাকা আদায়ে সর্বাত্মক সহোযোগিতার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের কাউকে কোন প্রকার হয়রানি না করতে আশ্বাসের পর তারা সড়ক থেকে তাদের অবরোধ তুলে নেন।
এদিকে এঘটনায় হামলা-মারপিট ও চাঁদাদাবির অভিযোগে সোমবার বেলা ১২ টায় পাইকগাছা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছেন, সাবেক পৌর কাউন্সিলর ও জোনাকি গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতির অন্যতম কর্ণধর কবিতা রানী দাশ।
তিনি পৌর শ্রমিকলীগের যুগ্ম আহবায়ক জাকির হোসেন ও পৌর বিএনপি’র যুগ্ম আহবায়ক মোস্তফা মোড়লের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে এ সংবাদ সম্মেলন করেন। অভিযুক্তদের বাড়ি পৌর সভার ৩ নং ওয়ার্ডে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে কবিতা দাশ জানান, তিনি একাধিক বার পৌরসভার ৪,৫ ও ৬ নং সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ডের নির্বাচিত কাউন্সিলর। কাউন্সিলর থাকাকালীণ পৌরসভাস্থ জোনাকি গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতির পরিচালক সাবেক কাউন্সিলর আলাউদ্দীন গাজী তাকে সমিতির আদায়কারী হিসেবে নিয়োগ দেন। এরপর দায়িত্ব পালনকালে গ্রাহক থেকে আদায়কৃত অর্থ সমিতির অনুকূলে প্রতিনিয়ত জমা দিয়ে বশীদ সংগ্রহে রাখেন।
এরপর সমিতির অর্থ তছরুপ, টানাপোড়েন শুরু হলে গ্রাহকরা পরিচালনা পর্ষদের পাশাপাশি তাকেও দায়ী করেন।
এক পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধিসহ স্থানীয় প্রশাসন পর্যন্ত গড়ালে এ নিয়ে একটি কমিটি করা হয়। গত আ’লীগের শাসনামলে শ্রমিকলীগের আহবায়ক জাকির হোসেন ও সমিতির অনেকেই তার উপর চাপ সৃষ্টি করে ১০ লক্ষ টাকা দাবি করে গ্রাহকদের সমন্বয় করার দায়িত্ব নিয়ে পরিচালনা পর্ষদের কাছ থেকে একাধিক চেক গ্রহন করেন।
তিনি আরোও উল্লেখ করেন গত ৫ আগস্টের পর জাকির হোসেন ও পৌর বিএনপি সাবেক সদস্য সচিব ও বর্তমান যুগ্ম আহবায়ক মোস্তফা মোড়ল এক হয়ে আমার বড়ীতে এসে দাবিকৃত টাকার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। কবিতা রানীর অভিযোগ, দাবিকৃত টাকা দিতে অস্বীকার করায় জাকির-মোস্তফা গ্রাহকদের উষ্কানি দিয়ে বিক্ষুব্ধ করে তোলেন। এক পর্যায়ে তারা গত ১৬ মে বিকেলে ৫০/৬০ জন লোক নিয়ে তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে তাকে মারপিট করে আহত করে। এ সময় তারা টাকা,স্বর্ণালংকার ও মুল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যায়।
খবর পেয়ে প্রশাসন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন বলে দাবি করে কবিতা ও তার পরিবারের সদস্যরা এ মুহুর্তে নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন দাবি করে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
শনিবার অবরোধ ককর্মসূচীতে বক্তব্য রাখেন, পৌর বিএনপির নেতা মোস্তফা মোড়ল, মৎস্য আড়ৎদারি সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি জাকির হোসেন, এফএম মাসুম বিল্লাহ, নাজমা বেগম, আমজেদ গাজী, আব্দুস সালাম, জাহিদুর রহমান, আজহারুল ইসলাম, মুন্নী, খুকুমণি, আব্দুল জলিল, শরিফা খাতুন, মতিয়ার রহমান, রওশানারা, জবেদা বেগম, ইমরান হোসেন, সাহেব গোলদার, ময়না বেগম, গফফার গাজী ও নুরজাহান বেগম।
প্রসঙ্গত, পৌর সদরের সরল বাজারস্থ জোনাকি গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতির কতৃপক্ষ নীতিমালা লঙ্ঘন করে সমিতির নামে বিভিন্ন ডিপোজিট কার্যক্রম চালু করে। অধিক মুনাফা লাভের আশায় এলাকার হাজার হাজার গ্রাহক অল্প দিনে যুক্ত হন সমিতির লোভনীয় বিভিন্ন ডিপোজিট কার্যক্রমের সাথে। স্থানীয় দিনমজুর থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ তাদের আয়ের সিংহভাগ টাকা জমা রাখেন জোনাকিতে।
প্রথম দিকে সমিতির লেনদেন স্বাভাবিক থাকলেও পরবর্তীতে গ্রাহকের লগ্নিকৃত টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হয় সমিতি কতৃপক্ষ। অনেকেই সারাজীবনের অর্জিত সব টাকা সমিতির অনূকূলে জমা করে সর্বশান্ত হয়ে পথে বসেছেন।
গত ৩ বছর সাধারণ গ্রাহকরা তাদের পাওনা টাকা আদায়ের দাবিতে বিভিন্ন দপ্তরে ধর্ণা ধরে ব্যার্থ হয়ে সর্বশেষ রাজপথ বেঁছে নিয়েছেন।
তাদের অভিযোগ, সমিতির প্রধান নির্বাহী ও সাবেক কাউন্সিলর আলাউদ্দিন গাজী, সভাপতি মোহাম্মদ গাজী, সমিতির কর্মচারী সাবেক কাউন্সিলর কবিতা দাশ এবং সালমা খাতুন সমিতির টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
এনিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে একাধিকবার আলোচনা এবং বৈঠক হয়েছে সমিতি কতৃপক্ষ ও গ্রাহকদের। গ্রাহকদের ইতোপূর্বে সমিতির কার্যালয় ঘেরাও সহ বিক্ষোভ সমাবেশ করতে ও দেখা গেছে। সর্বশেষ উপজেলা সমবায় কর্মকর্তার মাধ্যমে একটি কমিটি গঠন করে টাকা আদায়ের চেষ্টা চলছে বলেও জানানো হয়। ##