- রাবিদ মাহমুদ চঞ্চল ::
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি বা জোট নিয়ে ইতিমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে কড়ায় গন্ডায় হিসেব-নিকেশ শুরু হয়েছে। মুসলিম দেশ গুলোর জোট ভুক্ত হওয়ার সূচনার কারনে বেশ কিছু দেশের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিলেও কিছু দেশের ক্ষেত্রে গাত্রদাহ দেখা দিয়েছে। মূলত সৌদি আরব,তুরস্ক ও পাকিস্থানের মধ্যে চলতি বছরের ৭ আগস্ট মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে পাকিস্থানের উপস্থিতির কারণে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কপালে ভাঁজ দেখা দিয়েছে। তার উপর এই চুক্তিতে বা জোটে বাংলাদেশের যোগদান সংক্রান্ত ঘোষণা বা আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ হওয়ার পর থেকে ভারতের কপালের ভাঁজ গুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে বলে ঢেকুর উঠছে কূটনৈতিক মহলে। চিন্তার ভাজ কালো রেখারুপে দাদাদের কপালে জ্বলজ্বল করছে। তবে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদান বিপদজনক হবে এমন বক্তব্য এখনো ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শংকরের মুখ থেকে সরাসরি শোনা না গেলেও ভারতের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মূলত বলা হয়েছে -মক্কা জোটে বাংলাদেশের যোগদান সংক্রান্ত বিষয়টি তারা “ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ” করছে।
ইতিমধ্যে মি: জয়শংকর “বাংলাদেশ-ভারত পারস্পরিক স্বার্থের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ” হতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন। মক্কা জোটে যোগদানের ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উপস্থাপনের প্রাক্কালে মি: জয়শংকরের এই বক্তব্য খুব ভালোভাবে দেখছে না বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতীয় সংসদে দেওয়া এক বক্তব্যে ঘোষণা করেছেন, দেশের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কবর রচনা করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ আর কখনো কারও কাছে মাথা নত করবে না।
গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এই বক্তব্যে নতজানু পররাষ্ট্রনীতি বর্জনে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আরও বলতে শোনা গেছে, বর্তমান সরকারের দৃঢ় ও আত্মনির্ভরশীল কূটনীতির ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর যোগ্যতা অর্জন করেছে। অতীতে দেশের স্বার্থ রক্ষায় যে স্থবিরতা বা অনীহা ছিল, বর্তমান সরকার তা কাটিয়ে উঠেছে। ‘বৈদেশিক সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে পরিচালিত হবে। মক্কা প্যাক্ট ও মুসলিম উম্মাহ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা প্যাক্ট’ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন,মক্কা চুক্তিকে বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার একটি অভ্যন্তরীণ ও ইতিবাচক ব্যবস্থা হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ এই প্যাক্টে যোগদানের আমন্ত্রণ পেলে এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সদিচ্ছা থাকলে তা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমন বক্তব্যে থেকে স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত পাওয়া যায় বাংলাদেশ আর কারোর তাবেদারি মাথা পেতে নিচ্ছে না। পাশাপাশি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দেখানো “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়” পথ ধরে যে এগিয়ে যেতে চাইছে বর্তমান সরকার এটার স্পষ্ট ইঙ্গিত পরিলক্ষিত হচ্ছে।
এক্ষণে প্রশ্ন হলো মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের অংশ গ্রহণের বিষয়টি যদি ভারত “ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ” করার ঘোষণা দেওয়ার মধ্যে দিয়ে একটি মৌন বার্তা বাংলাদেশকে দেওয়ার চেষ্টা করছে এমনটা নয় কি..? স্বাধীন সার্বভৌম একটি ভূখণ্ড বা দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কোন দেশের সাথে চুক্তি করবে,কোন দেশের সাথে শত্রুতা পোষণ করবে এটা নিশ্চয়ই অন্য কোন দেশের কাছ থেকে হুকুমে হওয়া উচিত নয়। যে দেশ এমনটা আশা করেন তাদের এই আশা করা আদৌ সমিচিন নয়। আচ্ছা ভারত-ইসরাইল,ভারত-রাশিয়া,ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে আজ অব্দি যত চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে,যত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বা অস্ত্র বিনিময়, কেনাবেচা হয়েছে সেগুলো নিয়ে কখনো বাংলাদেশ কি আজ-অব্দি কোন মন্তব্য করছে..? কখনো কি ঘনিষ্ঠ বা গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করার কথা বলেছে..? উত্তর একটাই বলেনি। তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড.খলিলুর রহমান এখনো মক্কা চুক্তিতে যোগাদানের স্পষ্ট না করলেও পররাষ্ট্র নীতির বিষয়ে আপোষহীন বক্তব্য নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরীন অস্বস্তি যে দেখা দিবে এটা অস্বাভাবিক বিষয় নয়। কেননা দীর্ঘ একটা সময় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন বা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতে দাদাগিরির যে চর্চা ছিল তা হঠাৎ করে বন্ধ হওয়ার কারনে এশিয়ার অতি ক্ষমতা ধর দেশ হিসেবে তাদের কপালে চিন্তার ভাজ পড়া খুব স্বাভাবিক।
কিন্তু কারও ভালোলাগা, ভালো না লাগা, কারও স্বস্তি বা কারও অস্বস্তি নিয়ে বাংলাদেশের মক্কা চুক্তিতে যোগদান উচিত হবে বলে আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক মনে করে না। মক্কা চুক্তিতে যোগদানের পূর্বে বাংলাদেশের লাভ ক্ষতির হিসাব নিকাশ কষে অগ্রসর হওয়া উচিত। বোধকরি সরকারের নীতি নির্ধারণী মহল তেমনটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে অগ্রসর হচ্ছেন। সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গিতে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ সংযুক্ত হলে কি ধরনের লাভ বা ক্ষতি হতে পারে সে বিষয়ে আলোকপাত করা যেতে পারে। মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ অংশ গ্রহণ করলে সম্ভাব্য যে লাভ হতে পারে তাহলো -কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব:- সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো মুসলিম দেশগুলোর এই জোটে যুক্ত হলে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক প্রভাব বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা:- সদস্য দেশগুলোর সাথে যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ,গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি:- জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সুনামের কারণে এই জোটে দেশের অংশগ্রহণ একটি বড় মুসলিম দেশ হিসেবে রাজনৈতিক বৈধতা ও গুরুত্ব বাড়াতে পারে।
আর যে সম্ভাব্য ক্ষতি বা ঝুঁকিসমূহ দেখা দিতে পারে সেগুলো হলো -অন্যান্য দেশের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন: এই জোটে পাকিস্তান থাকায় ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে। এছাড়া চীন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক নীতি বা নিরপেক্ষতা বজায় রাখা জটিল হতে পারে।
অযাচিত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কা: এই চুক্তিতে পারস্পরিক নিরাপত্তার ধারা থাকায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে কোনো একটি দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশও অপ্রয়োজনে সেই সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
জাতি সংঘে শান্তিরক্ষী দেশের খ্যাতি ক্ষুণ্ন হওয়া:- কোনো নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক বা সামরিক বলয়ে জড়িয়ে পড়লে বৈশ্বিক অঙ্গনে নিরপেক্ষ শান্তিরক্ষী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের যে সুনাম রয়েছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে যারা পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে গবেষণা বা বিশ্লেষণ করে আসছেন তারা মনে করছেন এই চুক্তিতে অংশগ্রহণ করার বিষয়ে অপর কোন দেশের চাপ বা খবরদারী তোয়াক্কা না করে আবার নিজেকে অধিকতর ক্ষমতাবান না ভেবে শান্ত মস্তিষ্কে নিজের লাভক্ষতির অংক মেলাতে হবে।
সর্বোপরি তাড়াহুড়ো করে কোনো জোটে না গিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ,কৌশলগত স্বকীয়তা এবং পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য রক্ষা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে অধিকতর বুদ্ধিমত্তার কাজ।
