- নিজস্ব প্রতিবেদক ::
পাইকগাছায় কর্মকর্তার নির্দেশে পাউবোর কলোনির লেকের মাছ লুটের খবর প্রকাশে গাত্রদাহ শুরু হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ জড়িতদের। ঘটনা ধামাচাপা দিতে প্রশাসনসহ কতিপয় সাংবাদিক ম্যানেজে মিশন নিয়ে মাঠে নামানো হয়েছে অনুগত একটি মহলকে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আওতাধীন উপজেলার একটি সরকারি কলোনির লেক থেকে বিপুল পরিমাণ মাছ বিক্রির ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় খবর প্রকাশ হয়। এ বিষয়ে আগে থেকে সরকারি কোন অনুমতি কিংবা কোন প্রকার বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় পুরো বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পাউবোর এক কর্মকর্তার নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধায়নে সরকারি জলাশয় থেকে মাছ ধরে বিক্রি করা হয়। এরপর শুরু থেকেই অভিযুক্ত কর্মকর্তা দাবি করে আসছেন, মাছগুলো সরকারি অর্থে সেখানে ছাড়া হয়নি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত অর্থে চাষ করা মাছ আহরণ করা হয়েছে। ব্যাক্তি অর্থে মাছ ছাড়া হলেও সরকারি লেক ব্যবহারে উর্দ্ধতন কতৃপক্ষের পূর্বানুমতি না নেওয়ায় মূলত এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ৭ জুন সকালে পাইকগাছা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কলোনি সংলগ্ন লেকের মধ্যে প্রায় ৩০০ হাত লম্বা কাটি জাল দিয়ে মাছ ধরা হয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার অভিযানে রুই, কাতলা, তেলাপিয়া, ভেটকিসহ বিভিন্ন প্রজাতির বিপুল পরিমাণ মাছ আহরণ করা হয়।
পরে মাছগুলো স্থানীয় মাছ কাটার এক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আর এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকাবাসীর মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারোও কারোও দাবি, সরকারি অফিসের নিয়ন্ত্রিত লেক থেকে মাছ আহরণ ও বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের উন্মুক্ত দরপত্র, লিজ বা লিখিত অনুমোদনের তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে বিক্রয়লব্ধ অর্থ কোথায় গেছে কিংবা সেখানে মাছের পোনা অবমুক্ত ও পরে আহরণপূর্বক বিক্রির পুরো প্রক্রিয়াটি কতটা বৈধ ছিল, তা নিয়েও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, সরকারি সম্পত্তির আওতাভুক্ত কোনো জলাশয়ে ব্যাক্তি উদ্যোগে মাছ অবমুক্ত, আহরণ ও বিক্রির ক্ষেত্রে প্রচলিত বিধি-বিধান অনুসরণ করা জরুরি। অন্যথায় বিষয়টি আর্থিক অনিয়ম কিংবা সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার ঘাটতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, পাউবোর ১৬ নম্বর পোল্ডারের শাখা কর্মকর্তা (এসও) মোতালেব হোসেনের নির্দেশনায় মাছ ধরার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল কি না, সে বিষয়টি স্পষ্ট নয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. মোতালেব হোসেন, উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পুর)/শাখা কর্মকর্তা (এসও), পাইকগাছা পানি উন্নয়ন সেকশন-১ (পোল্ডার-১৬ ও ২৩), বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বলেন, ওই লেকে সরকারি অর্থে মাছ চাষ করা হয়নি।
আমাদের আগের কয়েকজন সহকর্মী ব্যক্তিগতভাবে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা করে দিয়ে সেখানে মাছ ছেড়েছিলেন। পরে সেই মাছ ধরা হয়েছে। এটি সরকারি রাজস্বের মাছ নয়, তাই রাজস্ব খাতে জমা দেওয়া হয়নি।” তিনি আরও জানান, স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়েই মাছ ধরা হয়েছে।

এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীকে অবহিত করা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, উনাকে জানানো হয়নি।”এ বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জহির মাজহার পরে কথা বলছি বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী বলেন, এটা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিষয়গুলো তাদের নিজস্ব প্রশাসনিক আওতাধীন। এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দপ্তরের। পানি উন্নয়ন বোর্ড যদি কোনো বিষয়ে সহযোগিতা চেয়ে আমাদের কাছে লিখিতভাবে পত্র দেয়, তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও সহযোগিতা করা হয়।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রিত কলোনির লেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে মাছ চাষের কোনো লিখিত অনুমোদন ছিল কি না এবং সরকারি স্থাপনার ভেতরে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার বিধান রয়েছে কি না।
এদিকে স্থানীয়রা দাবি করেছেন, পুরো ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য উদঘাটনপূর্বক জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহন জরুরী।
তাদের মতে, যদি সরকারি সম্পদ ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়া হয়ে থাকে, তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। অন্যদিকে, কর্মকর্তার দাবি সত্য হলে সেটিও যথাযথ নথিপত্রের মাধ্যমে জনসম্মুখে তুলে ধরা প্রয়োজন।
সমালোচিত ঘটনাটি শুধুমাত্র সরকারি লেকের মাছ বিক্রির বিষয় নয়, বরং এটি সরকারি সম্পদের ব্যবহার, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এব্যাপারে তদন্তপূর্বক যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি স্থানীয়দের।