ভারতীয় নাগরিকত্বের সত্যতা প্রমাণিত, বহাল তবিয়তে প্রধান শিক্ষক দীপক!
প্রকাশিত :
বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬
১৬
বার পঠিত
বিশেষ প্রতিনিধি :
আইনের চোখে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একই সাথে ভারত-বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিয়ে দীর্ঘ দিন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করা আলোচিত শিক্ষক এখনও বহাল তবিয়তে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের দপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদনে ভারতীয় ভোটার হওয়ার সত্যতা প্রমাণিত হলেও নেওয়া হয়নি কোন আইনি পদক্ষেপ। স্বগৌরবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর মাস পেরিয়ে গেলেও প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি কোন আইনী ব্যবস্থা। নাকি নিজের সব অন্যায় ঢাকতে উদ্ধর্তনের ম্যানেজ করে ফেলেছেন এমন প্রশ্ন এখন মুখে মুখে।
গত ২৯ জুন দেশের শীর্ষ গণমাধ্যম গুলোতে “পশ্চিমবঙ্গের ভোটার হয়েও খুলনায় স্কুলের প্রধান শিক্ষক” শিরোনামে খবর প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন সহ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর। ব্যাপক চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। একের পর এক জাতীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যম গুলোতে প্রচার করা হয় প্রধান শিক্ষকের দ্বৈত নাগরিকত্বের সংবাদ। কিন্তু প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও তার বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি কোন পদক্ষেপ। কি কারনে এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে থমকে গেল নাকি বিশেষ কোন সুবিধার দেওয়ার মধ্যে দিয়ে উপরের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে ফেলছেন বলে দাবী অভিযোগকারীর।
স্থানীয় প্রকাশ চন্দ্র সরকার বলেন, হেড স্যারের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। তিনি দ্বৈত নাগরিক। অন্য দেশের নাগরিকের বাংলাদেশ সরকারের বেতন ভাতা নেওয়া দন্ডনীয় অপরাধ। নিয়োগের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে তিনি ওপারে পাচার করেন। স্কুলের নামে বরাদ্দ এলে ভুয়া বিল ভাউচার করে তহবিল তছরূপ করেন। সব বিষয় সুস্পষ্ট ভাবে প্রমানিত। এ নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে অভিযোগ দিলেও ফলাফল শুন্য।
প্রসঙ্গত,খুলনার পাইকগাছা উপজেলার নবারুণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ভারতীয় নাগরিকত্ব থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। শুধু তিনি একানন তার স্ত্রী-কন্যা, ভাই-ভাবী সহ স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন পশ্চিমবঙ্গে আবার এদেশেও রয়েছে তাদের নাগরিকত্ব। এদিকে স্কুল চালাতে গিয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। নানা সময়ে একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনে দ্বৈত নাগরকিত্বসহ অন্যান্য অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
বিভিন্ন তদন্ত রিপোর্ট জানা গেছে, পাইকগাছার লস্কর ইউনিয়নে খড়িয়া নবারুন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারের ভারতীয় নাগরিকত্ব রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন নিবন্ধন আধিকারিকের দফতর থেকে প্রকাশিত ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে তার। উত্তর বর্ধমানের শক্তিগড় থানার ২ নং বরশুল গ্রামের ১ নং মনমোহন দে রোডের পশ্চিমাংশের বাসিন্দা তিনি। একই ব্যক্তি পাইকগাছা উপজেলার লস্কর ইউনিয়নের খড়িয়া ঢেমশাখালী গ্রামের ভোটার। পিতা নগেন্দ্র নাথ সরকার, মাতা সুমিত্রা রানী সরকার। এদিকে দীপকের স্ত্রী অপর্না সরকার, মেয়ে জয়শ্রী সরকার, বড় ভাই দুলাল চন্দ্র সরকার, ভাবী সুশীলা সরকার, ছোট ভাই তাপস সরকার ও তার স্ত্রী বর্ণালী সরকার সবাই স্থায়ীভাবে ভারতের নাগরিক ও ভোটার।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, পরিবার ভারতে পাঠিয়ে দিলেও দেশে বসে স্কুলকে পুঁজি করে তিনি অর্থবিত্ত তৈরি করছেন। স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি ও মোটা অংকের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে ২০২৪ সালে ১২ জুলাই স্কুলে পরিচ্ছন্নতা কর্মী পদে ভাইপো ভবেশ সরকার, নিরাপত্তা কর্মী পদে তৎকালীন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির অভিভাবক সদস্য রবীন ঢালীর ভাগ্নে পলাশ কুমার মন্ডল ও আয়া পদে প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারের আপন শালিকা লাবনী সরকার নিয়োগ দেওয়া হয়। গোপনীয়তা বজায় রেখে নিয়োগ প্রক্রিয়া চালানো হলেও ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর গ্রামবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে নিয়োগের ৫ দিন পর ১৬ জুলাই প্রধান শিক্ষকের দূর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ঝাড়ু মিছিল, মানববন্ধন সাংবাদিক সম্মেলন ও স্মারকলিপি প্রদান করেন। প্রতিবাদের মুখে তিন পদে চূড়ান্ত মনোনয়ন দিলেও দীর্ঘ দিন নিয়োগ পত্র চাপা রেখে দীর্ঘদিন পর ২০২৫ সালের ১লা সেপ্টেম্বর আকর্ষিক চাকরি বিধি লঙ্ঘন করে তাদেরকে প্রতিষ্ঠানে হাজির করা হয়। এই নিয়োগে অন্তত ত্রিশ লাশ টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে ২০২২-২৩ অর্থ বছরে স্কুলে প্রণোদনা অনুদান বাবদ বরাদ্দ পাঁচ লক্ষ টাকা খরচের ক্ষেত্রে হয়েছে পুকুর চুরি সম দুর্নীতি। শিক্ষক, সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থী এবং প্রতিবন্দি/ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রণোদনার ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা যথাযথভাবে ব্যয় হলেও বাকি টাকায় কাজের নামে করা হয়েছে নয়ছয়। যার বিল ভাউচার যথাযথ নয় বলে তদন্তে প্রমাণিত হয়।
নথিপত্র ঘেটে দেখা গেছে, প্রাপ্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নির্দেশে উপজেলা রিসোর্স অফিসার মো: ঈমান উদ্দিন ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর একটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এরপর ইউএনও’র নির্দেশে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শাহজাহান আলীর নেতৃত্বে গঠিত ৩ সদস্যের তদন্ত টিম ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারী আরেকটি প্রতিবেদন জমা দেয়। তখন পর্যন্ত উপরে উল্লেখিত ৩ জন কর্মচারী শুধুমাত্র মৌখিক ভাবে নিয়োগ পাবেন বলে জেনেছেন। নিয়োগ প্রাপ্ত ৩জন লিখিত ভাবে জানান ঐ তারিখ পর্যন্ত কোন নিয়োগ পত্র হাতে পাইনি বা কর্মক্ষেত্রে যোগদান করেননি।
একই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর জেলা শিক্ষা অফিসার এস এম ছায়েদুর রহমান আরও একটি তদন্ত করেন। এছাড়া চলতি ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারী জেলা প্রশাসক বরাবর প্রেরিত প্রতিবেদনে ইউএনও ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী বলেন, প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারের ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকত্ব রয়েছে বলে ভোটার তালিকা থেকে জানা যায়। এমপিও সংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষক-কর্মচারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হয়। বিদেশি নাগরিক এমপিওভুক্ত পদে থাকার বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ ও বিতর্কিত।
এদিকে ইউএনও’র প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) কানিজ ফাতেমা লিজা গত ২৬ ফেব্রুয়ারী মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার মহাপরিচালককে প্রেরিত এক প্রতিবেদনে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর ও স্পর্শকাতর হওয়ায় সদয় অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানান।
এবিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (বেসরকারি মাধ্যমিক -১) মোঃ জাকির হোসেন জানান, প্রাপ্ত অভিযোগের উপর ভিত্তি করে আমরা প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারকে ১০ কার্যদিবসে সময় দিয়ে শোকজ নোটিশ প্রদান করি কিন্তু তিনি কোন উত্তর দেননি। পরে দ্বিতীয় দফায় নোটিশ প্রদান করার পর তিনি লিখিত জবাব দাখিল করেছেন।
তার বিরুদ্ধে আইনগত কি ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা সমুদয় রিপোর্ট মহাপরিচালকের দপ্তরে উপস্থাপন করবো তিনি বিষয়টি দেখে শুনে যে ব্যবস্থা উপযুক্ত সেটা গ্রহণ করবেন বলে আশাকরি।
দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে দীপক চন্দ্র সরকার বলেন, আমি এ দেশের নাগরিক। আমি নিজে ভারতে ভোটার হইনি । কেউ আমাকে ফাঁসানোর জন্য আমাকে ভারতের ভোটার তালিকায় নাম ভুক্ত করেছেন। স্কুলের অনুদান আত্মসাৎ কিংবা নিয়োগ নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি।