- স্পোর্টস ডেস্ক ::
বিশ্বকাপের গ্রুপ নির্ধারণ হওয়ার পর দলগুলো নিজেদের সম্ভাবনার ওপর ভরসা করেই ধারণা করে নিয়েছিল নকআউটে তারা কার মুখোমুখি হবে! আর্জেন্টিনাও ভেবে নিয়েছিল স্পেন কিংবা উরুগুয়েকে তারা পাবে শেষ ৩২ এর ম্যাচে। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে সামনে চলে আসে কেপ ভার্দে। বিশ্বকাপের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম দেশ হিসেবে নকআউটে উঠে ইতিহাস গড়ে আফ্রিকান দেশটি।
ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে রুখে দিয়ে শুরুতেই চমক দেখায় কেপ ভার্দে। উরুগুয়ের বিপক্ষে লিড নেওয়ার পর পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়িয়ে ড্র করে। তারপর সৌদি আরবকে গোলশূন্য স্কোরে বিদায় করে গ্রুপের রানার্সআপ হয়েই নকআউট নিশ্চিত করে মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার এই দীপরাষ্ট্র। কেপ ভার্দে প্রতিপক্ষ হিসেবে চূড়ান্ত হওয়ার পরই আর্জেন্টিনা চমকে গিয়েছিল। তাদের খেলোয়াড় রদ্রিগো দে পল বলেছিলেন, ‘যখন ড্র হলো, তখন আমরা ভেবেছিলাম শেষ ৩২-এ হয়তো কোনো সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নের (স্পেন বা উরুগুয়ে) মুখোমুখি হতে হবে, যাদের দলে ইউরোপের বড় লিগে খেলা অনেক ফুটবলার আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা আর হয়নি।’
গ্রুপে অপরাজিত থেকে নকআউটে উঠে বিস্ময় জাগানো কেপ ভার্দেকে হালকাভাবে দেখেনি আর্জেন্টিনাও। আর প্রথমবার নকআউটে উঠেই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন মর্যাদা একটি দলের মুখোমুখি হওয়াকে বড় পুরস্কার হিসেবে দেখছিল আফ্রিকান দলটি। গ্রুপ পর্বের পারফরম্যান্স বিবেচনা করে এবং যে দলের কিছুই হারানোর নেই, তাদেরকে খাটো করে দেখার মতো দম্ভ প্রকাশ করেনি আর্জেন্টিনাও। বেশ সমীহ করেছে তারা। কিন্তু মাঠে নামার পর কল্পনার বাইরের ঘটনাগুলো ঘটতে থাকল।
মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা অনেক কষ্ট করে হলেও ম্যাচটি জিতেছে। ব্যবধানটা সামান্য হলেও জয়টা শেষ পর্যন্ত তাদেরই হয়েছে। কেপ ভার্দে নিখুঁতভাবে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। ম্যাচের প্রায় পুরোটা সময় নিজেদের কৌশল ধরে রেখেছে এবং খেলা উন্মুক্ত হওয়ার পরও সমানে সমানে লড়াই করেছে।
আর্জেন্টাইন দল অবশ্য তাদের সেরা ফর্মে ছিল না। তবে লিওনেল স্কালোনির কোচিংয়ের শুরু থেকে দলটির যে মূল শক্তি— ম্যাচের পরিস্থিতি বোঝা। সেটি তারা আবারও দেখিয়েছে। একটি বিবর্ণ পারফরম্যান্সের মধ্যেও তারা ঠিকই বুঝে নিয়েছিল কোথায় সুযোগ আছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী তারা তাদের আক্রমণভাগের কৌশল বদলেছে এবং শেষ পর্যন্ত মাঠের আধিপত্য দিয়ে নয়, বরং ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ম্যাচটি নিজেদের করে নিয়েছে।
আর্জেন্টিনার ৪-৪-২ ফরমেশন, যেখানে আক্রমণের সময় মিডফিল্ডে ডায়মন্ড আকৃতি ধারণ করে। তারা কেপ ভার্দের জমাটবাঁধা ৪-১-৪-১ ফরমেশনের মুখোমুখি হয়েছিল। আফ্রিকান দলটির সুশৃঙ্খল রক্ষণভাগ মাঠের দুই প্রান্ত পুরোপুরি বন্ধ করে রেখেছিল। ফলে আর্জেন্টিনাকে বাধ্য হয়েই মাঝমাঠ দিয়ে আক্রমণ করার চেষ্টা করতে হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের ডিফেন্সিভ ব্লক ভাঙার জন্য প্রতিটি পাসেই প্রয়োজন ছিল নিখুঁত গতি, নির্ভুলতা ও পারস্পরিক সমন্বয়। ধৈর্য্য ধরে আর্জেন্টিনা ধীরে ধীরে খেলাটিকে নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। ম্যাচের ১৫ মিনিটের মাথায় লিওনেল মেসি প্রথমবারের মতো একটি দারুণ আক্রমণ তৈরি করেন। তাতে ডি বক্সের একদম প্রান্তে একটি ফাউল পায় আর্জেন্টিনা।
কেপ ভার্দের অধিনায়ক মেন্দেসের বিপক্ষে ওয়ান-টু-ওয়ান পজিশনে মেন্দেস নিজেকে দারুণভাবে সামলে নেওয়ায় বাঁ-প্রান্তে আলমাদা কিছুটা স্বাধীনভাবে খেলার সুযোগ পাচ্ছিলেন। রদ্রিগো ডি পল নিজের পজিশন ছেড়ে অন্য প্রান্তে যাওয়ায় প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়রা তাকে ঘিরে ধরায় আর্জেন্টিনা সবচেয়ে কার্যকর আক্রমণগুলো করতে শুরু করে। তবে হাইড্রেশন ব্রেকের আগ পর্যন্ত কেপ ভার্দের সম্মিলিত দলগত প্রচেষ্টা ও রক্ষণভাগের দুর্দান্ত প্রচেষ্টায় আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ সুবিধা করতে পারছিল না।
বিরতির ঠিক পরপরই আর্জেন্টিনা তাদের পাসিংয়ের গতি বাড়িয়ে দেয় এবং প্রথম গোলটি পায়। লিসান্দ্রো মার্টিনেসের দারুণ বোঝাপড়া থেকে এই আক্রমণের শুরু। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে সরাসরি লম্বা পাস দেওয়ার মতো সামান্য ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছে। বুঝেশুনেই তিনি পাস দেন। বল মেসির পায়ে পৌঁছায় এবং তিনি সহজাত দক্ষতায় বল জালে জড়ান।
এক গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর আর্জেন্টাইন দল বুঝে যায়, প্রতিপক্ষের ডিফেন্সিভ অঞ্চলের ভেতরেই তাদের চাপ ধরে রাখতে হবে। ভার্টিকাল পাস, সার্বক্ষণিক মুভমেন্ট ও ড্রিবলিংয়ের মাধ্যমে তারা প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের এগিয়ে আসতে বাধ্য করেছিল। কেপ ভার্দের কোনো খেলোয়াড় পজিশন ছেড়ে না আসা পর্যন্ত আর্জেন্টিনার কোনো খেলোয়াড়ই বল ছাড়ছিলেন না। আর তখনই ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়ে কেপ ভার্দের রক্ষণে ফাঁটল ধরছিল।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই আফ্রিকান দলটি তাদের পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। কেপ ভার্দে লক্ষ্য করে যে মেদিনার সামনে আর্জেন্টিনার রক্ষণাত্মক ডিফেন্স কিছুটা দুর্বল। তাই তারা সেই নির্দিষ্ট জায়গা লক্ষ্য করে টু-অন ওয়ান পরিস্থিতিতে খেলা শুরু করে। সেখান থেকেই দুয়ার্তে প্রথম শট নেন এবং এর ১৫ মিনিট পরেই কেপ ভার্দে সমতাসূচক গোলটি পেয়ে যায়। এই গোলটির সূত্রপাত হয়েছিল এনজো ফের্নান্দেজের সামান্য মনোযোগহীনতার কারণে। তিনি নিজের মার্কিং হারিয়ে ফেলেছিলেন। এবং লিসান্দ্রোর কাভার দিতে কিছুটা দেরি হয়েছিল। এটি খুব বড় কোনো ভুল না হলেও সেটি প্রতিপক্ষের জন্য কাঙ্ক্ষিত গোলটি খুঁজে পাওয়ার পেতে যথেষ্ট ছিল।
আর্জেন্টিনা সাড়া দিয়েছে দ্রুত। অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই বাঁ প্রান্ত থেকে আসা একটি কর্নার কিকে কেপ ভার্দের ডিফেন্সের ফাঁক গলে লিসান্দ্রো একদম আনমার্কড অবস্থায় দূরবর্তী পোস্টে হাজির হন। একজন সেন্টার ফরোয়ার্ডের মতো হেডে গোল করে তিনি দলকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে নেন।
এই গোলের পর আর্জেন্টিনা আবারও প্রতিপক্ষের অর্ধে চড়াও হয়। নিকো গঞ্জালেস মাঠে নামার ফলে আক্রমণের জায়গা আরও বড় হয়। মলিনা আক্রমণে গভীরতা যোগ করেন এবং আর্জেন্টিনার পাসিং প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে পাশ পরিবর্তন করতে বাধ্য করে। তবে কেপ ভার্দে তখনও তাদের সেন্ট্রাল চ্যানেল সুরক্ষিত রাখাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছিল। বল হারানোর পরপরই কাউন্টার প্রেস করার কারণে আর্জেন্টিনা দ্রুত বল পুনরুদ্ধার করতে পারছিল এবং একাধারে আক্রমণ ধরে রাখছিল। তবে এই অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ক্লান্তি ভর করে। অন্যদিকে কেপ ভার্দে মাঠে নতুন খেলোয়াড় নামানোর কারণে নিজেদের ফর্মেশন ধরে রাখতে পেরেছিল।
এক পর্যায়ে রক্ষণভাগের পেছনের ফাঁকা জায়গাগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। কেপ ভার্দের ডিফেন্স ব্লক আরও প্রায় ১৫ মিটার পেছনে নেমে আসে। তাতে আর্জেন্টিনা মাঝমাঠ দিয়ে পাসিং, দূরপাল্লার শট, ক্রস ও সেট পিসের মতো বিকল্প উপায় খুঁজতে থাকে। কিন্তু নাটকের তখনও বাকি ছিল। আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় গোলের ঠিক ১০ মিনিট পর কেপ ভার্দে আবারও সমতা ফেরায়। সিডনি লোপেসের তীব্র চাপের মুখে পড়ে যান অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। লোপেস তাকে ড্রিবলিংয়ে পরাস্ত করে ডি বক্সের কোণা থেকে একটি অসাধারণ শটে গোল করেন।
দুই গোল শোধ দেওয়ার আত্মবিশ্বাস যেন আরও উজ্জীবিত করেছিল কেপ ভার্দেকে। যখন মনে হচ্ছিল ম্যাচটি টাইব্রেকারের দিকেই এগোচ্ছে, ঠিক তখনই ১১১ মিনিটের মাথায় আরেকটি সেট পিস থেকে ক্রিস্টিয়ান কুটি রোমেরোর দুর্দান্ত একটি হেডার আর্জেন্টিনার জয় এবং কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে।
তবে ম্যাচের শেষ মিনিটগুলো ছিল আর্জেন্টিনার জন্য অস্বস্তিকর। এটা অনেকটা বক্সিংয়ের শেষ রাউন্ডের মতো ছিল। যেখানে চ্যাম্পিয়ন ভালো করেই জানে যে সে পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে আছে, আর প্রতিদ্বন্দ্বী তার শেষ শক্তিবিন্দু দিয়ে লড়ে যাচ্ছে। মানসিক ও শারীরিকভাবে ক্লান্ত আর্জেন্টিনাকে শেষ কয়েক মিনিট ছেড়ে কথা বলেনি কেপ ভার্দে। ১১৬ মিনিটে বাঁ প্রান্ত থেকে লোপেসের ফ্রি কিক রকেট গতিতে লক্ষ্যে ছোঁটে। লাফিয়ে মার্টিনেজ সেই শট কর্নার বানান। তিন মিনিট পর সতীর্থের ক্রসে গোলমুখের সামনে পা বাড়ান বেঞ্চিমোল। বলে পা ছোঁয়াতে পারলে ভিন্ন কিছুই হতো। মার্টিনেজ বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আর্জেন্টিনাকে স্বস্তি এনে দেন। মেসিরা যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন।
আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ধরে রেখেছিল এবং জয়ী হয়েছে, তবে এই সামান্য ব্যবধানের জয় নিশ্চিতভাবেই তাদের পারফরম্যান্স নিয়ে নতুন করে পর্যবেক্ষণ করবে। এটা এই জন্য নয় যে তাদের জাত চেনাতে পারেনি। কারণ এবার তাদের গেম প্ল্যান ম্যাচ জেতার জন্য যথেষ্ট হলেও প্রতিপক্ষের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। তবে ইতিহাসের পাতায় এই ম্যাচ ‘ব্যাটল অব মায়ামি’ হিসেবেই হয়তো লেখা থাকবে, যেখানে পরাজিত হলেও গর্ব করবে কেপ ভার্দে।
ম্যাচ শেষে মেসিও স্বীকার করলেন ১২০ মিনিট ধরে তাদের কতটা ভুগিয়েছে কেপ ভার্দে। তিনি বলেন, ‘আমরা অগোছালো ছিলাম, ওরা সবসময় আমাদের চেয়ে একজন খেলোয়াড় বেশি পাচ্ছিল কারণ আমরা ওদের সাথে টেক্কা দিতে পারছিলাম না। ওদের পায়ে বল ছিল না, তাও ওরা আমাদের দৌড়ের ওপর রেখেছিল কারণ আমরা ঠিকমতো চাপ সৃষ্টি করতে পারছিলাম না।’
প্রথম তিন ম্যাচে ১০ সেভ করা ভোজিনহা এদিন এই আসরে নিজের সর্বোচ্চ আটটি সেভে আর্জেন্টিনাকে ভুগিয়েছেন, এর মধ্যে মেসিকে পাঁচবার রুখে দেন তিনি। আত্মবিশ্বাসের অনন্য উদাহরণ তিনি তৈরি করেছেন গোল লাইন ছেড়ে উপরে উঠে তিনটি প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়ে।
মাত্র ৩৬ শতাংশ সময় বল দখলে রেখেও কেপ ভার্দের ডিফেন্স আর ভোজিনহার অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স আর্জেন্টিনার নাভিশ্বাস তুলে ফেলেছিল। বলতেই হয়, কেপ ভার্দে বিদায় নিলেও বড় ছাপ রাখল বিশ্বকাপে। পরের আসরে তারা থাকবে কি থাকবে না, সেটা ভিন্ন কথা। তবে আন্ডারডগ হিসেবে বিশ্বকাপে নিজেদের এমনভাবে তারা চেনাল, যুগের পর যুগ তারা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।