দেশ স্বাধীনের ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও আটকে পড়া পরিচয়ে আমাদেরকে অবহেলিত করে রাখা হয়েছে। তাই আটকে পড়া পাকিস্তানি বা বিহারি হিসেবে নয়, আমরা উর্দূভাষী বাংলাদেশি হিসেবে স্বীকৃতি চাই। এটি আমাদের ন্যায্য দাবি। দাবি আদায়ে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাবো।
দেশের ১১৬টি ক্যাম্পে বসবাস করা বাসিন্দারা ‘উর্দুভাষী বাংলাদেশি’ হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি, মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবিতে মানববন্ধন চলাকালে সমাবেশে ওইসব কথা বলেন সৈয়দপুর উর্দূভাষী ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটি ও বাংলাদেশ উর্দূভাষী অধিকার আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ।
নীলফামারীর সৈয়দপুরে বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সৈয়দপুর প্রেস ক্লাবের সামনে বেলা ১১ টায় মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। যৌথভাবে এ কর্মসূচি পালন করে বাংলাদেশ উর্দূভাষী অধিকার আন্দোলন সৈয়দপুর সাংগঠনিক জেলা এবং সৈয়দপুর উর্দূভাষী ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটি।
এতে সভাপতিত্ব করেন সৈয়দপুর উর্দূভাষী ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির সভাপতি ও বাংলাদেশ উর্দূভাষী অধিকার আন্দোলন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. মাজিদ ইকবাল।
বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ উর্দূভাষী অধিকার আন্দোলন সৈয়দপুর সাংগঠনিক জেলা শাখার আহবায়ক মো. নাসির, যুগ্ম আহবায়ক আবু রায়হান, উর্দূভাষী ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির সিনিয়র সহ সভাপতি নুর হাসান মোলাম, সহ সভাপতি সানজিদা খাতুন, সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল লতিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শাহাজাদা, দপ্তর সম্পাদক মোছা. সোনি বেগমসহ ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির সদস্য মো. গোলাম, মোছা. হামিদা, আলাউদ্দিন, আজগার আলী, মোছা. বিন্দিয়া, ইসমাইল আলম, মো. শাহাজাদা, মো. চাঁন।
ঘন্টাব্যাপী চলা মানববন্ধন ও সমাবেশে সৈয়দপুরে ২২ টি ক্যাম্পের সহস্রাধিক নারী পুরুষ অংশ নেয়। এ সময় বক্তারা বলেন, দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে দেশের নয়টি জেলায় ১১৬টি ক্যাম্পে প্রায় তিন লাখ উর্দূভাষী মানবেতর অবস্থায় জীবনযাপন করছে। একজন নাগরিক হিসেবে জাতীয় পরিচয়পত্র পেলেও মৌলিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত রয়েছেন তারা।
বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই জনগোষ্ঠীকে ‘আটকে পড়া পাকিস্তানি, আটকে পড়া বিহারী’ পরিচয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে তাদের নাগরিক পরিচয় ও অধিকার নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তারা বলেন, উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্বের বিষয়টি স্পষ্ট করতে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হলে ২০০৩ ও ২০০৭ সালের রায়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০০৮ সাল থেকে ক্যাম্পে বসবাস করা বাসিন্দারা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের ‘উর্দুভাষী বাংলাদেশি’ হিসেবে পরিচিতির দাবি প্রতিষ্ঠা করেন বলে জানান বক্তারা।
তাদের অভিযোগ উচ্চ আদালতের রায় এবং জাতীয় পরিচয়পত্র থাকার পরেও তাদেরকে ‘আটকে পড়া’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। তাদের মতে, এ ধরনের পরিচয় নতুন প্রজন্মের সামাজিক মর্যাদা, নাগরিক অধিকার ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যা কখনই কাম্য নয় বলে নেতৃবৃন্দ মানববন্ধন চলাকালে চার দফা দাবি তুলে ধরেন।
দাবিগুলো হলো: দেশের ১১৬টি ক্যাম্পে বসবাসরত জনগোষ্ঠীকে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে ‘উর্দুভাষী বাংলাদেশি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, দ্রুত মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসনের কার্যকর প্রক্রিয়া শুরু করা, পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পবাসীর বিদ্যুৎ সংযোগ নিরবিচ্ছিন্ন রাখা এবং বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে সরকারি উদ্যোগ নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পবাসীরা বর্তমানে যেখানে আছেন, সেখানে তাদের অবস্থান বজায় রাখা এবং কোনো ধরনের উচ্ছেদ অভিযান না চালানোর দাবিও জানানো হয়।
বক্তারা ‘আটকে পড়া’ পরিচয়ের অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘উর্দুভাষী বাংলাদেশি’ পরিচয়ের মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসনের মাধ্যমে ক্যাম্পবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।