- রাবিদ মাহমুদ চঞ্চল :
ভারত ও ফিলিস্তিন জুড়ে চলছে মুসলিমসহ ভিন্ন ধর্মাবলম্বী নিধনযজ্ঞ। বিভিন্ন ইস্যুতে মুসলমানসহ ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসীদের কিভাবে নিধন করা যায় তার প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হচ্ছে ভারত ও ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে। ভারতে মুসলমানদের ধর্মীয় উপাসনালায় মসজিদ থেকে মাইক খুলে নেওয়া, মসজিদ ভাঙচুর,মসজিদে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে নামাজ বন্ধ করে দেওয়া, মুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবে গরু জবাই করতে না দেওয়া,গরু জবাহ করার অপরাধে হত্যা করা এখন ভারতে খুব সাধারণ একটি বিষয় হিসেবে রূপলাভ করেছে। এছাড়া প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে মুসলমানদের বাড়িঘর ভাঙচুর, মা বোনের সম্ভম নষ্ট করা, নির্বিচারে পিটিয়ে হত্যা করা এখন যেন কোন বিষয় না। ভারতে সম্প্রতি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, সহিংসতা এবং বৈষম্যের ঘটনা নিয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য বিলোপ কমিটির (সিইআরডি) একটি প্রতিবেদনে ভারতে বাংলাভাষী মুসলিম, দলিত, আদিবাসী এবং খ্রিস্টানদের ওপর চলমান নির্যাতন ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর একাংশের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। ইন্ডিয়া পার্সিকিউশন ট্র্যাকার’-এর তথ্যমতে, ২০২৬ সালের প্রথম ৭ মাসেই ভারতে অন্তত ৪৪ জন মুসলিম বিদ্বেষমূলক সহিংসতা ও বিভিন্ন ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে গো-রক্ষকদের গণপিটুনি, কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং উত্তর প্রদেশ ও অসমে মুসলিমদের ঘরবাড়ি ও ধর্মীয় স্থাপনা উচ্ছেদের মতো ঘটনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ভারতের উত্তর প্রদেশ,পশ্চিমবঙ্গ এবং ছত্তিশগড়ের মতো রাজ্যগুলোতে খ্রিস্টানদের ধর্মীয় সভা ও চার্চে কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী দলগুলোর হামলার ঘটনা ঘটেছে। “জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ”-এর অভিযোগ তুলে ধর্মান্তরবিরোধী আইনের অপব্যবহার করে যাজক ও সাধারণ বিশ্বাসীদের আটক ও হয়রানি করার ঘটনা ঘটছে। তফসিলি জাতি, দলিত এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষজনও উগ্রপন্থী গোষ্ঠী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশের দ্বারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও জাতিগত সহিংসতার শিকার হয়েছেন এবং এখনো হচ্ছেন।
অন্যদিকে প্যালেস্টাইনে মুসলিম নর-নারী,শিশুকে বর্বরভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হচ্ছে। গণহত্যা চালিয়ে প্যালেস্টাইনকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার সব রকম প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহু। গাজায় ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৭১ হাজার ৬০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ। এছাড়া বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যু হয়েছে অগণিত মানুষের। প্রচন্ড খাদ্য সংকট নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে ফিলিস্তিনবাসী। দেশী-আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এমন খবর দেখা যাচ্ছে হর হামেশাই।
এমন উৎকণ্ঠময় পরিস্থিতিতে অনেকেই হয়তো ভাবছেন ভারতের নরেন্দ্র মোদির সরকার বা কট্টরবাদী ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহুর সময়কালে সৃষ্ট ঘটনার তা কিন্তু নয়,বহু বছর পূর্ব থেকে ভারত ও ইসরাইল কর্তৃক মুসলিম নিধনযজ্ঞের এধারা চলমান রয়েছে। বিচার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়,এই দুটি দেশের দৃষ্টিভঙ্গি একই। তাদের স্বভাব চরিত্র মুদ্রার এপিঠ ওপিটের মত। সেকারনে সুস্পষ্ট ভাবে মনে রাখতে হবে তাদের প্রধান শত্রু হলো মুসলিম উম্মাহ এছাড়া তাদের তালিকায় সংখ্যায় কম হলেও মুসলিম বাদেও ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী মানুষও রয়েছে।
তবে পূর্বের সময় ভারতের অভ্যন্তরে ও ইসরাইল কর্তৃক মুসলিম নিধনযজ্ঞের মাত্রার সূচক অনেকখানি নিম্নগামী থাকলেও মোদি ও নেতানিয়াহু সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে নিধনযজ্ঞ তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে দেখা যায় ভারতে উগ্রবাদী আরএসএস ও উগ্রবাদী কিছু সম্প্রদায়ের নেতৃত্বে প্রশাসনের সহযোগিতায় এই হত্যা,খুন ও ধর্মীয় কাজে বাধা সৃষ্টি করার বিষয়টি উদ্বেগ জনক হারে বেড়ে গেছে। অন্যদিকে দেখা যায় নেতানিয়াহু ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে প্যালেস্টাইনের উপর একের পর এক বীভৎস নারকীয় হামলা চালিয়ে নর-নারী,আবাল, বৃদ্ধ বনিতা,শিশু হত্যার হোলি খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। সংগত কারণে প্রশ্ন উঠতে পারে ভারতে বিজেপি সরকার আর ইসরাইলের নেতানিয়াহু সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে চলমান এই মুসলিম হত্যা কি বন্ধ হবে? এমন প্রশ্ন যাদের মন ও মস্তিষ্কে বসবাস করছে তাদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট করে কিছু কথা বলা একান্ত আবশ্যক। এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে সারা বিশ্বের সবচেয়ে উগ্র মুসলিমবিদ্বেষী দুই দেশের নাম ভারত ও ইসরাইল। উভয় দেশে ইসলামোফোবিয়া রাজনৈতিক অঙ্গন ছাড়িয়ে জনগণের বৃহৎ অংশের মধ্য বিস্তৃত হয়েছে। কেউ যদি মনে করে থাকেন যে নির্বাচনে হেরে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে কট্টরপন্থী নরেন্দ্র মোদি বা ইসরাইলের নেতা নেতানিয়াহু অপসারিত হলেই ভারত ও ইসরাইলের মুসলমানদের উপর চলমান জুলুম অবসান ঘটবে এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে দেশ দুইটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ ফিরে আসবে তাহলে তিনি বোকার স্বর্গে বসবাস করছেন। কেননা অতীত ইতিহাস এটাই বলে যে, যেকোনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট কিংবা প্রধানমন্ত্রী কর্মকান্ডের মধ্যে জনগোষ্ঠীর চিন্তা চেতনার প্রতিফলন ঘটবে। অনেকে হয়তো এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন এবং প্রশ্ন তুলতে পারেন যে, জনমতকে তো নেতাই প্রভাবিত করে থাকেন। আমি মনে করি এই কথাটি পুরোপুরি সত্য নয় তবে আংশিক সত্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেতাকে নির্বাচনে জিততে হলে জনগণের পালস্ বুঝে চলতে হয়। সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয় অভিমতের বিরুদ্ধে গিয়ে কোন নেতার পক্ষে সফল হওয়া কঠিন এবং সময় সাপেক্ষ অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভবও। মানুষের মন অল্প সময়ে পরিবর্তন হয় না।
মনের পরিবর্তন ঘটানো দীর্ঘ সময়ে ব্যাপার। ভারতের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচন গুলোর পূর্ব মুহূর্তে মুসলিমদের উপর নিগ্রহের মাত্রা বহুগুন বেড়ে যায় এর পিছনে ভারতীয় জনগোষ্ঠীর নির্বাচন হিসাব নিকাশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চলতি বছরের অক্টোবরে ইসরাইলের সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সেখানে নেতানিয়াহু সহ সব সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীর প্রচারের মূল বয়ান হলো প্যালেস্টাইনের মুসলমান নারী ও শিশুকে কে কত সফল ও বর্বর ভাবে নির্যাতন হত্যা করতে সক্ষম হবে। গণহত্যা চালিয়ে প্যালেস্টাইন কে নিশ্চিহ্ন করে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করতে যার পরিকল্পনা ইসরাইলে ভোটারদের কাছে সবচেয়ে কার্যকর মনে হবে,সেই আসন্ন নির্বাচনে বিজয়ী হবে। সুতরাং বলা যায় ভারতের নরেন্দ্র মোদি এবং ইসরাইলের নেতানিয়াহু কোন রোগের রোগী নয়, তারা দুজনেই রোগের উপসর্গ মাত্র। ভারত ও ইসরাইলের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মান্ধতাই সেখানকার আসল রোগ। আমরা বরাবরই পশ্চিমা দেশগুলোর উপর সরাসরি মুসলিম হত্যার দায়ী চাপিয়ে দেই কিন্তু এসব দেশে সরকার প্রধান ইচ্ছা করলেও অনেক কিছুই জনগণের চাপে পড়ে করতে পারেন না। যেমন ধরুন ইরানের উপর হামলার পূর্ব থেকেই খোদ মার্কিন মুলুকে সাধারণ জনগণ তীব্র আন্দোলন শুরু করে। ইসরাইলের কট্টর সমর্থক প্রেসিডেন্ট ট্রাম পর্যন্ত জনগণের চাপে অনেকটাই থমকে গিয়েছিল অথচ ইসরায়েল আক্রমণ চালানোর মাত্র দুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আবুধাবিতে গিয়ে ইসরাইলকে পিতৃভূমি এবং ভারতকে মাতৃভূমি ঘোষণা করে এসেছিলেন। যারা সারাদিন বাংলাদেশে বসে ভারতের নামে যপতে যপতে প্রভু জ্ঞানে বিজয় ধ্বনি দিতে থাকেন,মহান বন্ধু, বন্ধু প্রতিম বিভিন্ন ধরনের উপমা দিয়ে থাকেন সে সমস্ত পাঠকদের উদ্দেশ্যে একটু জানিয়ে রাখতে চাই কিছুদিন আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভারত বাংলাদেশের বিপক্ষে ভোট দিয়ে ক্ষান্ত থাকেনি, ইসরায়েলি সমর্থনপ্রাপ্ত সাইপ্রাস কে জিতানোর জন্য সরাসরি প্রচার চালিয়েছে। তো সব মিলিয়ে ভারত ও ইসরাইলের জনগণের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নরেন্দ্র মোদি ও নেতানিয়াহুদের জন্ম হয়। সুতরাং নরেন্দ্র মোদী কিংবা নেতানিয়াহু ভোটে হেরে গেলেই মুসলিম বা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের নিধনযজ্ঞ বন্ধ হবে এমন কোন গ্যারান্টি নেই বা কেউ গ্যারান্টি দিতেও পারবে না। কারন নরেন্দ্র মোদি ও নেতানিয়াহু হলো স্বভাবজাত কলের পুতুল। রাজনৈতিক যে চাণক্য নীতি ভারত ও ইসরায়েল আজন্মকাল ধরে অনুসরণ করে আসছে তা অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। শুধুমাত্র দেখা যায় ক্ষমতায় বসা মানুষগুলো বদলে যাচ্ছে কিন্তু চাণক্য নীতির বদল হচ্ছে না বা হবেও না। তাহলে সু স্পষ্টভাবে বলা যায়, মূলত মুসলিম নিধনযজ্ঞের অন্তরালে তারাই দায়ী যারা মোদি ও নেতানিয়াহুর মত নেতার মত কালে কালে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে সরকার গঠন করে আসছেন।